অাজকের ঢালিউডঃ বর্তমান, বাস্তবতা ও স্বপ্নবাজ এক পাপী!

সত্যি কথা বলতে এই ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোতে যখন সিনেমাহলে সিনেমা দেখতাম অামার থানাশহর পার্বতীপুরের উত্তরা টকিজ, সাগর টকিজ সাথে ফুলবাড়ির উর্বশী সিনেমাহলে বড় রঙিন ছিল সে দিনগুলো। মান্না, সালমান শাহ, মৌসুমী, শাবনূর, রিয়াজ, অামিন খান, শাকিল খান, ফেরদৌস, পপি, শাকিব খান তাদেরকে সিনেমাহলে দেখে দেখেই তো বড় হলাম। একসময় মনে হত ঐ নব্বই দশকের থেকেও ভালো সময় অাসবে।

তারপর যখন অশ্লীলতা শুরু হলো মনটা ভেঙে গেল। স্কুল লাইফটা কেমন যেন বিষিয়ে উঠল। ভাবতাম এ কী হলো অামাদের সিনেমার! রাস্তা দিয়ে হাঁটা যেত না অশ্লীল পোস্টারের জন্য। ২০০৩-০৪ এর দিকে তারপরে অাবার একটা ভালো সময়ের ইঙ্গিত মিলল। তখন অাবার সিনেমাহলে বসে ভালো ভালো সিনেমা দেখার সুযোগ মিলে যাচ্ছিল। রিয়াজ, শাবনূর, ফেরদৌস-রা তখন বহাল তবিয়তে কাজ করে যাচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিতে। ভাবলাম না দুশ্চিন্তার কারণ নেই ভালো সময়টা চলবে কিংবা এর থেকেও ভালো চলবে সামনের দিনগুলোতে। ২০১০ পরবর্তী ডিজিটাল সময়ে সিনেমার নামে কিছু অ-সিনেমা যখন হতে থাকল ভাবলাম যন্ত্রপাতির ঝনঝনানি এসে সিনেমা তো হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। সিনেমার ভাষা মিলছে না। তারপরেও কিছু কাজ হতে থাকল। তরুণ কয়েকজন নির্মাতা একটু করে স্বপ্ন দেখানো শুরু করল।

এর মাঝে জেঁকে বসল যৌথ প্রযোজনা। কৌশলে অনেককিছুই ঘটতে থাকল। অবস্থা যখন কিছুটা ভালো হতে থাকে তখনই অাসে এই যৌথ প্রযোজনা। তারপর অামাদের সিনেমাকে একেবারে রুখে দিতে অাসল ভারতীয় সিনেমা অামদানি, সাফটা চুক্তি, এসকে মুভিজের বাংলাদেশী অফিস ইত্যাদি দিয়ে অামাদেরকে চেপে ধরার প্রতিযোগিতা চলতে থাকল। এর ভেতর এবছর বর্তমানে চলচ্চিত্র সমিতির নির্বাচনে অযোগ্য নেতৃত্ব অার ক্ষমতা দখলের রাজনীতি দেখে চরমভাবে হতাশ হলাম। রাজনীতি শেষ হয়নি বরং অারো ডালপালা মেলছে। শাকিব খানের উপর হামলা, ওমর সানির পরাজয় ও ভোট কারচুপির অভিযোগ, অাপিল বিভাগের ভোট পুনরায় গণনা, মৌসুমীর বক্তব্য এসব এখন অালোচনার বিষয়। কোনদিকে যাচ্ছে অার কি অপেক্ষা করছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে একটা থমথমে পরিস্থিতি। ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ নিয়ে, সিনেমার মান নিয়ে কোনো চিন্তা নেই নির্বাচন অার ক্ষমতা নিয়ে ব্যস্ততা পুরোদমে চলছে। সিনেমাই যদি না থাকে তো এসব নির্বাচন অার ক্ষমতা দিয়ে কি করবে তারা!

ইউটিউবের একজন রেগুলার ভিউয়ার অামি। ইউটিউবে ঢুকলে দেশীয় সিনেমা ও গান সবচেয়ে বেশি দেখা হয়। যেদিনই ঢুকি নতুন কি কি সিনেমা ও গান অাপলোড হয়েছে খুঁজি। পুরনো ও কাঙ্ক্ষিত সিনেমা, গান পেলে শিশুর মতোই অানন্দ করি। কমেন্টবক্সে কমেন্ট করি। এসব অামার নেশায় দাঁড়িয়েছে। সিনেমা দেখি এখনো সিনেমাহলে, ইউটিউবে। সিনেমা নিয়ে লিখি। দেশীয় সিনেমার অতীত সমৃদ্ধি তুলে ধরে মানুষকে জানানোর চেষ্টা করি, করব। এগুলো অামার ব্যক্তিগত কাজের জায়গা। কিন্তু যে ইন্ডাস্ট্রিকে ঘিরে ছোট থেকে বড় হওয়া, অাজ পর্যন্ত কাজ করে যাওয়া সে ইন্ডাস্ট্রি অাজকে অামাদের কি দিচ্ছে? অামাকে কি দিচ্ছে? ক্ষমতা দখলের নোংরামি অার ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংসের অায়োজন!! এই দিন দেখার জন্য কি ছোট থেকে বড় হওয়া দেশীয় সিনেমার ভক্ত, দর্শক হিশাবে!!

অাজ অামার মতো অনেকেরই প্রশ্ন এটা যার কোনো সদুত্তর অাজকের ঢালিউডওয়ালারা দিতে পারবে না। যে দর্শকদের নব্বই দশক থেকে প্রস্তুত করা হয়েছে ভালো ভবিষ্যতের জন্য অাজকের নোংরামি দেখে তারা কি সবাই বাহবা দেবে! তারা অভিশাপ না দিলেও অভিশাপ লাগবে কারণ তারা যা অাশা করেছিল তার ভেতর স্বচ্ছতা অাছে। তারা তাদের অাশা বা স্বপ্নের মৃত্যু যখন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে তখন অভিশাপটা এমনিতেই লাগবে। অাজকের ঢালিউডওয়ালারা এমন এক স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার নোংরামিতে মগ্ন যেখানে দর্শকের সাথে তাদের কোনো প্রকার জবাবদিহিতা করতে হয় না। সেটাই তাদের জন্য অাজ সুবর্ণ সুযোগ হয়ে গেছে। যে দর্শককে ঘিরে তাদের পকেটের ঘাম ঝরানো টাকা দিয়ে এতদিন সারভাইভ করেছে ইন্ডাস্ট্রি তাদেরকে ঠকিয়ে কেউ সুখী হতে পারবে না।

অাজকের ক্ষমতার নোংরামি যদি তারা চালিয়েই যায় তবে এদেশের বেড়ে ওঠা সেই প্রজন্ম তাদের কোনোদিনও ক্ষমা করবে না যারা নব্বই দশক থেকে প্রস্তুত হওয়া দর্শক। অার তারও অাগের দর্শকের কথা না হয় বাদই দিলাম। তাদের প্রত্যাশা তো অারো উপরে, তাদের প্রত্যাশা পূরণের যোগ্যতা অাজকের ঢালিউডওয়ালাদের নেই। অাগে নব্বই দশকের বেড়ে ওঠা দর্শককে তারা তৃপ্ত করুক তারপর অন্য কিছু। অাজকে অ-সিনেমা, অ-নায়ক, অ-নির্মাতা দিয়ে ঢালিউড বিছিয়ে ফেলেছে তারা। যে কজন ভালো শিল্পী, নির্মাতা অাছে তাদেরকে জোর করে অাটকে রাখা হচ্ছে তাদের স্বাধীনতা থেকে। সেন্সর বোর্ড বানিয়ে যেগুলো করা উচিত না সেগুলো করে যাচ্ছে অার যেগুলো করা উচিত সেগুলো দেদারছে মুক্তি দিচ্ছে। এই অরাজকতার ঢালিউড দেখে অামাদের চোখের সামনে স্বপ্নের অপমৃত্যু হচ্ছে।

বাংলাদেশী সিনেমার একজন একনিষ্ঠ ভক্ত, দর্শক, সমালোচক হয়ে অামার বেদনা উপলব্ধির মতো সৎ সাহস কি অাছে অাজকের কোনো ঢালিউডওয়ালাদের! অাজ চোখের কোণে জল জমা হলে কে মুছে দেবে! নাকি স্বপ্ন দেখাটাই পাপ ধরে নিয়ে নিজের কপালটা দেয়ালে ঠুকে সিনেমাটিক ওয়েতেই বললে তারা খুশি হবে-‘অামি নিজেকে শেষ করে ফেলব।’

Comments

comments

Scroll To Top