তারকা তৈরিতে একজন পরিচালকের অবদানঃ প্রেক্ষিত ঢালিউড

আমি ও আমার সমবয়সীরা যখন সিনেমা হলে বাংলা সিনেমা দেখে দাপিয়ে বেড়াতাম তখন অনেক নায়কের মাঝে ওমর সানী নামের একজন নায়ক ছিল । ওমর সানিকে নিয়ে আমাদের সময়ে অনেক হাসাহাসি হতো এবং বর্তমান প্রজন্মও হাসাহাসি করে কারণ ওমর সানির অভিনয় নিয়ে। ওমর সানির অভিনয় ততোটা ভালো ছিলো না বা ওমর সানী অভিনয়ে পক্ক ছিলেন না । কিন্তু আমার সমবয়সী যারা সেই সময় নিয়মিত বাংলা সিনেমা দেখতো তারা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না যে এই অপরিপক্ক ওমর সানী জনপ্রিয়তা ছিলো এবং সালমান শাহ’র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো । সেই সময়ে সালমানের ছবির সাথে যুদ্ধ হতো সানীর ছবির।

সালমানের কেয়ামত থেকে কেয়ামত , অন্তরে অন্তরে, তুমি আমার, স্বপ্নের ঠিকানা, বিক্ষোভ সিনেমার বিপরীতে সানীর আখেরি হামলা, চাঁদের আলো, আত্ম অহংকার, প্রথম প্রেম, দোলা, লজ্জা’র মতো সুপারহিট সিনেমা আছে । কারণ কি জানেন ??? ……কারণ একটাই , সেই সময়ে কয়লাকে ঘষে মেজে সোনা বানানোর মতো প্রযোজক পরিচালক ছিলেন এই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে যারা বুঝতেন , জানতেন কাকে কি দিয়ে কি হবে এবং কিভাবে কার ভেতর থেকে সেরাটা বের করে আনতে হবে তা। অথচ সেই সময় জসিম , ইলিয়াস কাঞ্চন , রুবেল, হিট এবং মান্না নতুন হিট ছিলেন , নাইম ছিলেন নবীন প্রজন্মের হিট অথচ এরপরেও উনারা সালমানের বিপরীতে দাঁড় করালেন যে কিনা অভিনয়টা ততো ভালো জানে না, সালমানের মতো ততো স্টাইলিশ নন এমন একজনকে এবং সেই তুরুপের তাস বেশ ভালোই খেল দেখিয়েছিল ।

সেই সময়ের টিএনজাররা সালমান – সানী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলো । একপাশে যখন তমিজউদ্দিন রিজভি, মোহাম্মদ হান্নান, শাহ আলম কিরন, শিবলি সাদিক , মালেক আফসারি’রা সালমানকে নিয়ে দারুন দারুন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন ঠিক সেই একই সময়ে এ জে মিন্টু, নাদিম মাহমুদ, রায়হান মুজিব, জীবন রহমান , সোহানুর রহমান সোহান, মনোয়ার খোকন, আজিজুর রহমান’রা ওমর সানীকে দিয়ে পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন। সানীর লম্বা চওড়া , ঝাঁকড়া চুলের লুকটাকে কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মের নতুন দর্শকদের জন্য পরিচালকরা সানীকে কাজে লাগিয়েছিলেন যার ফলে সুশীল দর্শকদের কাছে একেবারে খ্যাঁত হিসেবে পরিচিত সানীও হয়েছিলেন বাণিজ্যিক চলচিত্রের সময়ের সেরা একটি রত্ন ।

বাংলা চলচ্চিত্রের জসিমের নাম শুনে নাই এমন দর্শক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। জসিমের শুরুটা হয়েছিল সহ খলনায়ক হিসেবে আর শেষটা হয়েছিল অ্যাকশন কিং নায়ক হিসেবে যা বাংলা চলচ্চিত্রের এক বিস্ময় হয়ে আছে আজো এবং থাকবে আগামীতেও । জসিমকে নিয়ে সেদিনের সুশীল, নাক উঁচু দর্শক যাদের সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার মুরদ হয়নি কিন্তু পত্রিকার পাতায় আর টেলিভিশনে চলচ্চিত্র সম্পর্কে বড় বড় গল্প করে নিজেকে বিরাট কিছু মনে করাতেন তাঁরা অনেক হাসাহাসি করতো এবং আজো এই দেশের সুশীল দর্শকরা জসিমকে নিয়ে হাসাহাসি করে। সানীর তো নায়ক হিসেবে চেহারা , ফিগার ভালো ছিল , জসিমের সেটাও ছিলো না !!!!! যার শুরুটা হয়েছিল জহিরুল হকের ‘’রংবাজ’’ চলচ্চিত্রে বস্তির গুন্ডা চরিত্র দিয়ে , যিনি একসময় ববিতার বাবার চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন সেই জসিম হয়েছিলেন ৮০-৯০ দশকের বাংলা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির বক্সঅফিস কাঁপানো নায়ক!!!!! কারণ জসিমের চেহারা , ফিগার ভালো ছিলো না কিন্তু জসিমের মাঝে যা ছিলো তা অন্য কারো মাঝে ছিলো না যা হলো ‘’প্রভিতা’’ ও ‘’আন্তরিকতা’’। এই দুটোকে সেই সময়ের প্রযোজক পরিচালকরা ১৬ আনাই কাজে লাগিয়ে জসিমকে করে তুলেছিলেন ‘’অ্যাকশন কিং’’ হিসেবে তুমুল জনপ্রিয় এক নায়ক। যে জসিম ক্যারিয়ারের ৫০ টা চলচ্চিত্রে নায়কের হাতে মার খেয়েছিলেন সেই জসিম হয়ে গেলেন খলনায়কদের যম আর দর্শকদের খুব আপন একজন মানুষ। অথচ জসিমের চেয়েও সুদর্শন, তরুণ অভিনেতা মাহমুদ কলি , ইমরান, মিঠুন’রা ছিলেন জসিমের চেয়ে অনেক অনেক পিছিয়ে। রাজ্জাক, আলমগির, উজ্জ্বল, ফারুক, ওয়াসিম, সোহেলরানা’র মতো জসিমের নামেও সিনেমা চলতো সেইসময়। অথচ কিছুদিন আগেও পর্দায় উল্লেখিত নায়কদের হাতেই জসিমকে মার খেতে দেখেছিল দর্শকরা , সেই একই দর্শকরা খলনায়কদের যম হয়ে উঠা জসিমকে সাদরে গ্রহন করেছিলো ।

পরিচালকরা জানতেন দর্শকরা জসিমের কাছে কি চায়, জসিমের ছবিতে কি চায় আর সেইভাবেই একের পর এক চলচ্চিত্রে জসিমকে উপস্থাপন করতেন পরিচালকরা । মজার ব্যাপার হচ্ছে যে পরিচালকদের একাধিক চলচ্চিত্রে দর্শকরা ভয়ানক খলনায়ককে দেখেছিলেন সেই একই পরিচালকদের চলচ্চিত্রে পরবর্তীতে জসিমকে নায়ক হিসেবে দেখেছিল । দেওয়ান নজরুল, এ জে মিন্টু , জহিরুল হক, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, আলমগির কুমকুম ,শফি বিক্রম্পুরি যারা খলনায়ক জসিমকে তৈরি করেছিলেন তারাই নায়ক জসিমের উত্থানে হাত বাড়িয়েছিলেন । যে এ জে মিন্টুর প্রতিজ্ঞা, বাঁধনহারা, চ্যালেঞ্জ চলচ্চিত্রে জসিম ছিলেন খলনায়ক সেই এ জে মিন্টু সর্বপ্রথম জাতীয় চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ পরিচালক শাখায় পুরস্কার জিতেছিলেন জসিমকে নায়ক বানিয়ে ‘’লালু মাস্তান’’ চলচ্চিত্রের জন্য । প্রবীণদের সাথে নবীন রায়হান মুজিব, এফ আই মানিকরাও জসিমকে ব্যবহার করেছিলেন চমৎকার ও সুনিপুণভাবে যার ফলে জসিমের জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে ৯০ দশকের নতুন প্রজন্মের দর্শকরাও জসিম ভক্ত হয়েছিল। জসিম মানেই দর্শকদের কাছে ‘’ইয়া ঢিসুমা’’ !!! জসিমের চলচ্চিত্র মানেই স্কুল কলেজ পলাতক নবীন দর্শকদের ভিড় । সালমান , সানী, মান্না, রুবেল , কাঞ্চন এমন কারো ভক্ত নেই যে জসিমের ছবি সিনেমা হলে গিয়ে না দেখে থাকতো পারতো। জসিমের চলচ্চিত্র মানেই ১৬ আনাই পয়সা উসুল ।

প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা’র ছোট ভাই পরিচয়ে ১৯৮৬ সালে রুবেল নামে একজন নায়ক চলচ্চিত্রে এসেছিলেন । ‘লড়াকু’র মতো নতুন দিনের আধুনিক গল্পের চলচ্চিত্র দিয়ে রুবেলের পর্দায় আগমন যা দিয়েই সেই সময়কার কিশোর তরুণদের মন জয় করে নিয়েছিলেন রুবেল । এরপরের গল্পটা একটা ইতিহাস …। রুবেল হয়ে উঠেছিলেন পরবর্তী এক দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম ক্ষমতাধর ও সফল নায়ক । অথচ রুবেলের চেহারা ও দৈহিক গড়ন খুব আহামরি কিছু ছিলো না। সেই খুব সাধারন রুবেল পর্দায় ছিলেন অসাধারনরুপে এবং ক্যারিয়ারের ১ম ১ দশকে যার কোন চলচ্চিত্র ফ্লপ ছিলো না। রুবেল মানেই পুঁজি ফেরত পাওয়ার গ্যারান্টি। রুবেলের চলচ্চিত্রের গুরু এবং বাংলা চলচ্চিত্রের অসাধারন মেধাবী পরিচালক প্রয়াত শহিদুল ইসলাম খোকনের নির্মিত ২০টি সুপারহিট চলচ্চিত্রের নায়ক রুবেল । শুধু শহিদুল ইসলাম খোকন নন , রুবেলকে কেন্দ্র করেই একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সফল হয়েছিলেন আহমেদ সাত্তার, আবুল খায়ের বুলবুল , এ জে রানা, রানা নাসেরের মতো নবীন পরিচালকরা। যাদের নাম শুনলেই দর্শক চোখ বন্ধ করে বলে দিতো রুবেলের নতুন সিনেমা আসছে । কারণ রুবেল মানেই সেই সময় মার্শাল আর্ট ভিত্তিক কংফু অ্যাকশন আর জমজমাট গল্প ।

রুবেলের এই প্রভাব ছিলো সিনেমার বাইরে বাস্তবেও। সেই সময়ে সারা বাংলাদেশে মার্শাল আর্ট ভিত্তিক আত্মরক্ষা শেখার স্কুল/ একাডেমীগুলো গড়ে উঠেছিল রুবেলের চলচ্চিত্র দেখে ও রুবেলের জনপ্রিয়তার উপর ভর করেই। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পোস্টারে থাকতো রুবেলের ছবি । শুধু তাই নয় , যারা কংফু শেখার স্কুলে ভর্তি হতে পারতো না , তারাও বাসায় গোপনে মার্শাল আর্টের বিভিন্ন কলাকৌশল প্র্যাকটিস করে হাত পা ভাঙতো যার জন্য দায়ী ছিলেন নায়ক রুবেল । রুবেলের এই একটি গুনকে কাজে লাগিয়ে গল্প তৈরি করে রুবেলের কাছ থেকে সেরা অভিনয়টা বের করে আনতো সেই সময়ের পরিচালকরা। সেই সময়কার পরিচালকদের চেষ্টা ও শ্রমের কারণে কেউ কখনও বলতে পারতো না যে রুবেল অভিনয় জানে না । রুবেলের অভিনয়টা বের করে আনার দায়িত্বটা সেই সময়ের পরিচালকরা এতো দারুন ভাবে পালন করেছিলেন যার ফলে রুবেল হয়ে উঠেছিল নবীন প্রবীণ সব পরিচালকদের কাছে আস্থার অভিনেতা। রুবেলের সিনেমা মানেই সব বয়সী দর্শকদের কাছে পরিপূর্ণ নিখাদ বিনোদন ।
ওমর সানী, জসিম, রুবেল’রা আজ বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক নয়।

আজ বাংলা চলচ্চিত্রে সানী, জসিম রুবেলের চেয়েও অনেক সুদর্শন নায়ক অভিনয় করছে অথচ একজন নায়কও এখনও বর্তমান চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির আস্থা অর্জন করতে পারেনি । এই না পারার কারণটার জন্য দায়ী যত না বেশী নায়কের তার চেয়েও বেশী দায়ী বর্তমান সময়ের পরিচালক ও দর্শকদের। ২০০৮ সালে মান্না মারা যাওয়ার পর এই ইন্ডাস্ট্রির সবাই ঝুঁকেছিল একজনের দিকে যার ফলে ইন্ডাস্ট্রি হয়ে উঠেছিল একজন কেন্দ্রিক এবং একজনের উপরই নির্ভরশীল। যে নির্ভরশীলতা আজ কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য। কোন প্রযোজক পরিচালকদের দেখলাম না যে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের জন্য নতুন কোন শিল্পীকে তৈরি করতে। সবাই অন্ধের মতো একজনের পিছনে ছুটেছে ফলে সেই একজনই হয়ে উঠেছিলেন ইন্ডাস্ট্রির সর্বসবা। কেউই ঝুঁকিতে যেতে চায়নি। ফলে গত ১ দশকে সিনেমা দেখার যে দর্শক গড়ে উঠেছিল তারাও হয়ে উঠেছে স্বৈরাচার মানসিকতার । সেই দর্শকরা যতটা না বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমি তার চেয়েও বেশী প্রেম হলো ঐ এক নায়কের যার ফলে আজ তাদেরকে ‘ভক্ত’ না বলে ‘চাটুকার’ বলা হয়। ভক্ত নামধারী ঐ চাটুকাররাও তাঁদের পছন্দের নায়ক ব্যতীত অন্য কাউকে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ছিলো না এবং অন্য কোন অভিনেতার চলচ্চিত্রকে গ্রহণ না করে নিরুৎসাহিত করতো কিংবা নেতিবাচক প্রচারণা চালাতো ।

ঐ এক পক্ষের দেখাদেখি নতুন আসা অভিনেতা অভিনেত্রীদের ভক্তরাও হয়ে উঠেছে এক কেন্দ্রিক বা স্বৈরাচার যারা অন্যর পছন্দ অপছন্দকে সম্মান দিতে জানে না কিংবা অন্যর মতকে সম্মানকে করে না । এই প্রবণতাটা একদিনে তৈরি হয়নি । আমাদের মেধা শুন্য ইন্ডাস্ট্রির দুঃসময়টাকে পুঁজি করে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে । এখন ইন্ডাস্ট্রিতে মেধাবী প্রযোজক পরিচালকদের মহাদুর্দিন চলছে যারা আরেকজন নতুন কোন মেধাবী শিল্পী তৈরি করতে পারছে না যার ফলে সুদর্শন নায়ক থাকলেও কোন কাজে আসছে না। মডেলিং , টিভি নাটক থেকে একেকজন নায়ক আসে যায় কিন্তু কেউই ঝলক দেখাতে পারছে না কারণ ঝলক বের করে আনার কারিগরই তো নেই । বাঘহীন বনে সব হনুমানই নিজেকে বাঘ মনে করে যা আসলে বন নয় চিড়িয়াখানার একটি হনুমানের খাঁচা ছাড়া কিছুই নয় ।

Comments

comments

Scroll To Top