ধর্ম ও সিনেমাঃ সাম্প্রতিক ‘আল্লাহ মেহেরবান’ বিতর্ক ও কিছু কথা

আমার বাবা বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সিগঞ্জের) ছেলে। তার বন্ধুমহলের এক-তৃতীয়াংশই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। হয়তো সেই কারণেই তার মুখে অন্যকোন ধর্মকে খাটো করে বলা কোন কথা কোনদিন শুনিনি। আমার জন্ম নারায়ণগঞ্জে। আমার বাড়ির পাশেই ছিল জেলেপাড়া। ছিল অসংখ্য হিন্দু বন্ধু। বাবার ডিএনএ’র কারণেই হোক বা আমার সামাজিকীকরণের কারণে, আমিও কোনদিন হিন্দু বন্ধুদের আলাদা কোন জাতের চোখে দেখিনি। এলাকার সবাই জানত আমি হিন্দু বন্ধুদের সাথে এক প্লেটে ভাত খেতাম। এতে আমার বা ঐ হিন্দু বন্ধুদের জাত যায়নি।

তখন ক্লাস এইটে পড়ি। মোবাইল বা ইন্টারনেট এখনকার মত এভেইল্যাবল ছিল না। ডিশ লাইন সব ঘরে থাকলেও ডিভিডি প্লেয়ার ছিল শুধু আমার এক হিন্দু বন্ধু সজিৎ এর বাসায়। বন্ধু আরাফাত কোথা থেকে যেন ব্লু ফিল্মের ডিস্ক যোগাড় করত। সজিতের মা-বাবা বাড়ির বাইরে থাকলেই আমি, সজিৎ আরো তিন মুসলিম বন্ধু বসে পড়তাম নীল ছবি দেখতে। একদিন মনোযোগ দিয়ে দেখেছিলাম, উত্তেজনা যখন চরমে এমন সময় সজিৎ রিমোট দিয়ে ডিভিডি প্লেয়ার বন্ধ করে দেয়। আমরা চার বন্ধু রেগে গিয়ে ওকে যা-তা বলে গালাগালি করতে থাকি। ও ঠান্ডা মাথায় বলল “দোস্ত, আজান হইতাছে”। একজন হিন্দু বন্ধুর এই ব্যবহারে আমাদের চার মুসলিম বন্ধুর রাগ মুহুর্তে লজ্জায় পরিণত হলো।

এর কিছুদিন পর একবার সরস্বতী পূজার সময় মন্ডপের সামনে আমরা বেশ কয়েকজন মুসলিম-হিন্দু বন্ধু মিলে নাচছিলাম। সেখানে সজিৎও ছিল। হঠাৎ ও গান বন্ধ করে দিল। সবাই চেঁচিয়ে উঠতেই ও বলল, “দোস্ত, এশার আজান হইতাছে, নামাজ শেষ হইলে আবার ছাড়মু।” সজিৎ ছিল আমাদের বন্ধুমহলের মধ্যে সবচেয়ে কম পড়ালেখা জানা, মাত্র থ্রি পাশ। কিন্তু ওর কাছ থেকে অন্যের ধর্মকে সম্মান জানানোর যে শিক্ষা পেয়েছি, তা মাস্টার্স ডিগ্রিধারী কোন শিক্ষকের কাছেও পাইনি।

যাহোক, এবার মূল কথায় আসি। ধর্ম ও সিনেমা। সিনেমা দেখা হালাল নাকি হারাম, পাপ নাকি পুণ্যের কাজ, আমি সেই বিতর্কে যাবো না। আমি ক্ষুদ্র জ্ঞানে জানি একটি গোটা সিনেমায় যদি একবারও আল্লাহতালা বা সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা না করা হয়, তাহলে সেটা দোষের কিছু হবে না। কিন্তু একবারও যদি সৃষ্টিকর্তা বা কোন ধর্মকে অবমাননা করে কিছু বলা বা করা হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেটা ধর্মাবলম্বীদের আঘাত করবে। কারণ সিনেমা দেখা মানেই কিন্তু ধর্মকে অবজ্ঞা করা না। সব ধর্মই হয়তো বলবে “সিনেমা দেখা ঠিক না” তারপরও আমরা ধর্মের কথাকে পাশ কাটিয়ে সিনেমা দেখি মনে অন্তত এই সান্তনা নিয়ে যে “আল্লাহপাক আমাদের ক্ষমা করে দিবেন”। কিন্তু সেই আল্লাহপাককে অবমাননা করেই যদি সিনেমা বা সিনেমার গান নির্মিত হয়, এবং সেটা যদি আমরা যেকোন ধর্মের লোকই সাপোর্ট করি, তাহলে লানত আমাদের নিজেদের উপর।

সম্প্রতি বস-২ নামের একটি যৌথ প্রযোজনার সিনেমায় “আল্লাহ মেহেরবান” গানটি নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। হওয়ারই কথা। গতবছর একই প্রোডাকশন হাউজ থেকে একই নায়ককে নিয়ে “ঈদ মোবারক” নামে একটি গান বের হয়েছিল। যেটার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের মুসলিম দর্শকদের ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে নাড়া দেওয়া। এক্ষেত্রে তারা সফল হয়েছিল, যদিও নামাজ পড়া, রোজা রাখা এই “মুসলিম” নায়কের মায়ের নাম ছিল “ভবানী”, সে বোনকে দিদি, তার বোন তাকে দাদা বলে ডেকেছিল। মোটকথা “যৌথ প্রযোজনা মানেই যেন যৌথ ধর্ম পালন করা”। এর আগে আরেকটি যৌথ প্রযোজনার সিনেমার টাইটেলে দেখেছিলাম “সকল প্রশংসা অল্লাহ তালার”। আল্লাহর নাম কি তারা ভুল করেই লিখেছিলেন নাকি ইচ্ছে করেই ভুল করেছিলেন সেটা আল্লাহই ভাল জানেন।

আবার আসি “আল্লাহ মেহেরবান” প্রসংগে। গতবছরের ছবির মত পরিচালক এবারো চেয়েছিলেন আল্লাহর নাম ব্যবহার করে আরেকটি গান রাখতে যাতে বাংলাদেশের দর্শকদের মনে হয় এটা মুসলমানদের ছবি তথা বাংলাদেশিদের ছবি। তবে বাবা যাদব নামের হাবা গর্দভ পরিচালক হয়তো জানতেন না এদেশের মানুষ আইটেম গান পছন্দ করে, কিন্তু তার চেয়ে কোটিগুণ বেশি ভালোবাসে তার ধর্মকে। এই গানের নায়িকার নাম সিনেমাতে “আইশা (আয়েশা), মুসলমানদের কাছে পবিত্র একটি নাম, অথচ তাকে দিয়ে অশ্লীল পোশাকে, অশ্লীল নৃত্য করানো হয়েছে। আমার মনে হয় পরিচালক ইউটিউবে “বেলি ড্যান্স” দেখেছেন, এবং সেখান থেকেই তার মাথায় এই ফালতু গানের আইডিয়াটা এসেছে। আরব দেশে পতিতা বা নর্তকীরা এই ধরণের স্বল্প পোশাক পরে আরবি গানে বেলি ড্যান্স করে। মাথামোটা এই পরিচালককে কে বোঝাবে আরবের ঐ সংস্কৃতি উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির সাথে যায় না, এবং আরবি ভাষার গান মানেই ইসলামি গান নয়। ইসলাম কেন, পৃথিবীর কোন সভ্য ধর্ম, সভ্য জাতি নারীদের বুকের ভাজ আর নাভির খাঁজ দেখিয়ে নেচেগেয়ে সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে তার ইবাদত করে না। এটা ধর্মের অবমাননা ছাড়া আর কিছুই না। আল্লাহর নাম নেওয়ার অধিকার শুধু মুসলমানদেরই আছে এমনটা নয়, পৃথিবীর সব ধর্মের, সব মানুষেরই আছে। কিন্তু পৃথিবীর কোন ধর্মকে খাটো করার অধিকার পৃথিবীর কারো নেই।

তাই আমি মনে করি বস-২ সিনেমা থেকে এই বিতর্কিত গানটি বাদ দিয়ে সিনেমাটি মুক্তি দেওয়া হোক। আর সেন্সরবোর্ড নিয়ে আমার কিছু বলার নাই। গানটি ধর্মবিরোধী না হয়ে সরকারবিরোধী হলে তারাই তখন বলত। আসুন সবাই নিজ নিজ ধর্মের সাথে অন্যের ধর্মকেও সম্মান জানাই। কারন সবশেষে আমরা এক পরম করুণাময়ের দয়ার উপরই নির্ভরশীল। তার নির্দেশে এসেছি এবং তার কাছেই ফিরে যেতে হবে।

Comments

comments

Scroll To Top