নারীর কথা বলে বলিউডের যে সিনেমাগুলো!

সিনেমায় সাধারণত নায়ক অর্থাৎ পুরুষরাই মূল চরিত্রে অভিনয় করে থাকেন। বলিউড সিনেমাতেও এর ব্যতিক্রম হয় না। সিনেমায় যেখানে পুরুষের সুঠাম দেহ, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর মারপিটে উপস্থাপনা দেখে দর্শক বিমোহিত হয় সেখানে নারীকে উপস্থাপন করা হয় সিনেমার শোভা বর্ধনকারী বাণিজ্যিক পণ্যের মতো।

তবে দিন পাল্টেছে। পর্দায় নারীর উপস্থাপনের প্রথাগত ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে বলিউড। বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীতে এসে বলিউডে অনেক সিনেমা নির্মিত হচ্ছে যেখানে নারী তারকারাই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন। এসব সিনেমা বাণিজ্যিকভাবে সফলতার পাশাপাশি  সমালোচকদের কাছেও সাদরে গৃহীত হয়েছে। প্রধান চরিত্র হিসেবে নারীর অভিনয় করা অসাধারণ কিছু বলিউডের সিনেমা নিয়েই এই আয়োজন।

লজ্জা (২০০১) : ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন স্তরে বাস করা নারীদের দুর্দশা উপজীব্য করেই সিনেমাটি তৈরি হয়েছে। ধনী থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত কিংবা বিত্তহীন- সর্ব স্তরের নারীরা কীভাবে বিভিন্ন সামাজিক প্রথা আর পুরুষের নোংরা মানসিকতার বলি হয় তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে সিনেমাটিতে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন মাধুরী দীক্ষিত, রেখা, মনীষা কৈরালা, মাহিমা চৌধুরীর মতো জনপ্রিয় অভিনেত্রীরা।

চাঁদনী বার (২০০১) : অভিনেত্রী টাবুর অভিনয় জীবনের অন্যতম সেরা সিনেমাটি এটি। দরিদ্র ঘরের সুন্দরী এক মেয়ে যাকে ভাগ্যান্বেষণে শহরে এসে প্রতিনিয়ত চালিয়ে যেতে হয় নিজের সম্মান বাঁচানোর যুদ্ধ- এমনই এক মেয়ের সংগ্রামী জীবনের কাহিনি নিয়ে এক দুর্দান্ত সিনেমা ‘চাঁদনী বার’। এই সিনেমায় অনবদ্য অভিনয় করে টাবু জিতে নিয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

শক্তি : দ্য পাওয়ার (২০০২) : নিজের সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য এক মায়ের নিরন্তর সংগ্রামের কাহিনি নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘শক্তি : দ্য পাওয়ার’। অ্যাকশন-ড্রামা ঘরানার এই সিনেমাটি ইরানি লেখক বেটি মাহমুদির উপন্যাস ‘নট উইদাউট মাই ডটার’ অবলম্বনে নির্মিত। শক্তিমান অভিনেতা নানা পাটেকার আর বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিশমা কাপুরের অভিনয় সব মহলে বেশ প্রশংসিত হয়েছিল।

ওয়াটার (২০০৫) : ত্রিশের দশকে ভারতীয় উপমহাদেশে নারীর সামাজিক অবস্থান, বাল্যবিবাহ এবং তার অভিশাপ নিয়ে খ্যাতিমান পরিচালক দীপা মেহতার সিনেমা ‘ওয়াটার’। সিনেমার প্রধান চরিত্রে বিধবার বেশে  অভিনয় করেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান মডেল লিসা রে। প্রায় একা সিনেমার কাহিনি সামনে টেনে নিয়েছেন তিনি।

ফ্যাশন (২০০৮) :  এই সিনেমার জন্য প্রিয়াঙ্কা চোপড়া এবং কঙ্গনা রাণৌত দুজনেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছিলেন। সুতরাং এই সিনেমা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। মডেলিং জগতের পিছনের কাহিনি নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘ফ্যাশন’। কেন্দ্রীয় চরিত্রে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আর কঙ্গনা রাণৌত দুজনেই পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। এছাড়া পার্শ্ব চরিত্রে মুগ্ধা গডসে আর কিরণ জুনেজার অভিনয়ও ছিল দুর্দান্ত।

নো ওয়ান কিলড জেসিকা (২০১১) : ১৯৯৯ সালে সংঘটিত নয়াদিল্লীর উঠতি মডেল জেসিকা লালের হত্যাকাণ্ডের সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সিনেমা ‘নো ওয়ান কিলড জেসিকা’। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিদ্যা বালান ও রানী মুখার্জি। দুই নারী তারকা নিয়ে নির্মিত এই সিনেমাটি বলিউডের পুরুষকেন্দ্রিক যে কোনো ক্রাইম-থ্রিলার সিনেমার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

দ্য ডার্টি পিকচার (২০১১) : দক্ষিণ ভারতের বিতর্কিত চিত্রনায়িকা সিল্ক স্মিতার জীবন কাহিনি নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র। বলা চলে বিদ্যা বালানের আরেকটি অনবদ্য চলচ্চিত্র। এই সিনেমাটিতে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য ২০১১ সালে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও জিতে নিয়েছেন বিদ্যা। বিদ্যার পাশাপাশি সিনেমাটিতে পার্শ্ব চরিত্রে ইমরান হাশমি এবং কিংবদন্তি অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

কাহানি (২০১২) : আবারো বিদ্যা বালান। বলিউডে যত নারীকেন্দ্রিক সিনেমা হয়েছে তাতে সবচেয়ে বেশি অভিনয় করেছেন বিদ্যা বালান। ‘কাহানি’ সিনেমায় নিখোঁজ স্বামীর সন্ধান পাওয়ার জন্য লন্ডন থেকে কলকাতায় আসা এক অসহায় স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিদ্যা। এই সিনেমার জন্য বিদ্যা ফিল্মফেয়ার, আইফা, স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড, স্টার গিল্ড অ্যাওয়ার্ডসহ মোট সাতটি পুরস্কার জিতেছেন।

ইংলিশ ভিংলিশ (২০১২) : ভাষার প্রতিবন্ধকতায় আটকে থাকে না কিছুই। এটিই ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ সিনেমার মূল বিষয়বস্তু। এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় অভিনেত্রী শ্রীদেবী ‘ইংলিশ ভিংলিশ’-এর মাধ্যমে বলিউডে প্রত্যাবর্তন করেন। কারণ এই সিনেমার মাধ্যমে ১৯৯৭ সালে ‘জুদাই’ সিনেমার পর দীর্ঘ বিরতি ভেঙে তিনি পর্দায় ফিরে আসেন। তবে তিনি ফিরেছিলেন রানির বেশে। কারণ এর আগে বিরতি ভেঙে ফিরে আসা কোনো অভিনেত্রী তার মতো সাফল্য পাননি।

কুইন (২০১৪) : কঙ্গনা রাণৌতের সিনেমা ক্যারিয়ারের অন্যতম সফল সিনেমা ‘কুইন’। এ সিনেমায়  অভিনয়ের জন্য দ্বিতীয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতেন কঙ্গনা। যা তার অভিনয় জীবনে মাইলফলক হয়ে থাকবে। রানী নামের দিল্লির এক সাধারণ তরুণীর গল্প কীভাবে দুর্দান্ত অভিনয়ের গুণে অসাধারণ হয়ে উঠে, ‘কুইন’ সিনেমটি তার প্রমাণ। পার্শ্ব চরিত্রে লিসা হেইডনের অভিনয়ও ছিল দারুণ।

গুলাব গ্যাং (২০১৪) : সিনেমার কাহিনি আবর্তিত হয়েছে ভারতের উত্তর প্রদেশের নারীদের বিখ্যাত দল গুলাব গ্যাংকে কেন্দ্র করে। গল্পে রাজনীতিকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়ে বানানো এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী মাধুরী দীক্ষিত ও জুহি চাওলা। অ্যাকশন-ড্রামা ঘরানার এই সিনেমাটি সংলাপ, আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারে সমালোচকদের বেশ প্রশংসা অর্জন করে।

মারদানি (২০১৪) : রানী মুখার্জির অভিনয় নিয়ে সন্দেহ করার মতো মানুষ হাতে গোনা অল্পই বলা চলে।  ক্রাইম-থ্রিলার এই সিনেমাটিতে শক্তিশালী এক নারী পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করেন রানী। অসাধারণ অভিনয় করেছেন পুরো সিনেমা জুড়ে। একাই টেনে নিয়েছেন সিনেমার সবটুকু আলো। হয়তো রানী বাদে অন্য কেউ এই সিনেমা করলে এত ভালো করতে পারতেন কিনা সন্দেহ প্রকাশ করেন অনেকেই।

মেরি কম (২০১৪) : ভারতের অলিম্পিক পদকজয়ী মুষ্টিযোদ্ধা মেরি কমের জীবনী নিয়ে সিনেমা ‘মেরি কম’। সিনেমায় উঠে এসেছে মণিপুরের ছোট একটি গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেরি কমের বিশ্বসেরা বক্সার হয়ে ওঠার গল্প। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে প্রেম, বিয়ে আর দুই সন্তানের মা হওয়ার পর ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখার লড়াই। সব মিলিয়ে এই সিনেমায় প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে অন্য এক রূপে দেখা যায়।

পার্চড (২০১৬) : চার নারীর ঝলসে যাওয়া জীবনের বাসনার কথা নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘পার্চড’। ব্যক্তিগত জীবনে তাদের নিজস্ব সমস্যা, পুরুষদের অবহেলা আর অত্যাচার মাথায় নিয়েই তাদের দিন কাটাতে হয়। কিন্তু তাদের মনে রয়েছে অনেক সুপ্ত বাসনা। এই চার নারী তাদের সুপ্ত ইচ্ছের কথা, স্বপ্নের পুরুষের কথা, যৌনতার কথা আলোচনা করে সিনেমার গল্পজুড়ে। এতে অভিনয় করেছেন রাধিকা আপ্তে, তন্নিষ্ঠা চ্যাটার্জি, আদিল হোসেন, অদিতি গুপ্তা ও সুরভিন চাওলাসহ অনেকে।

Comments

comments

Scroll To Top