নিয়তি (২০১৬) মুভি রিভিউ

চলচ্চিত্রের নামঃ নিয়তি (২০১৬) মুক্তিঃ ১২ই আগস্ট ২০১৬ অভিনয়েঃ আরিফিন শুভ, ফাল্গুনী রহমান জলি, সুপ্রিয় দত্ত, ঈশানী, মৌসুমী সাহা, আরমান পারভেজ মুরাদ, নাদের চৌধুরী প্রমুখ। পরিচালনাঃ জাকির হোসেন রাজু প্রযোজনাঃ জাজ মাল্টিমিডিয়া (বাংলাদেশ) ও এসকে মুভিজ (কলকাতা) কাহিনি ও চিত্রনাট্যঃ আবদুল্লাহ জহির বাবু চিত্রগ্রহনঃ সাইফুল ইসলাম শাহিন সম্পাদনাঃ তৌহিদ হোসেন চৌধুরী সংগীতঃ স্যাভি প্রারম্ভিক কথাঃ …

Review Overview

পরিচালনা
কাহিনী
চিত্র্যনাট্য
চিত্রগ্রহন
সম্পাদনা
অভিনয়

Summary : এই সিনেমাতে আরেফিন শুভর বলা একটি সংলাপ সম্ভবত অনেকদিন মাথায় থাকবে-“ও যদি পাগলও হয়ে যায়, আমাকে চিনতে নাও পারে ,তাও ঐ পাগলটাকেই আমি ভালোবাসবো“- সত্যিকারের ভালোবাসার সংজ্ঞা সম্ভবত এটাই- মনের মানুষ ঠিক যেরকম আছে, সেটা ভাল হোক বা মন্দ- সবসময় তার পাশে থাকা এবং তাকে সাহস দেয়াটাই সম্ভবত ভালোবাসা।

User Rating: 3.09 ( 8 votes)
79

চলচ্চিত্রের নামঃ নিয়তি (২০১৬)

মুক্তিঃ ১২ই আগস্ট ২০১৬

অভিনয়েঃ আরিফিন শুভ, ফাল্গুনী রহমান জলি, সুপ্রিয় দত্ত, ঈশানী, মৌসুমী সাহা, আরমান পারভেজ মুরাদ, নাদের চৌধুরী প্রমুখ।

পরিচালনাঃ জাকির হোসেন রাজু

প্রযোজনাঃ জাজ মাল্টিমিডিয়া (বাংলাদেশ) ও এসকে মুভিজ (কলকাতা)

কাহিনি ও চিত্রনাট্যঃ আবদুল্লাহ জহির বাবু

চিত্রগ্রহনঃ সাইফুল ইসলাম শাহিন

সম্পাদনাঃ তৌহিদ হোসেন চৌধুরী

সংগীতঃ স্যাভি

প্রারম্ভিক কথাঃ দুজন মানুষের দেখা হবে, প্রথম দেখায় ভাল লাগবে অথবা হয়ত লাগবে না, হয়ত একজনের আরেকজনকে দেখলে গা জ্বলে যাবে-তারপরেও “কিছু একটা” থাকবে। যাকে দেখলে একসময় গা জ্বলে যেত, একসময় তাকে দেখার জন্যই হয়ত মন পুড়ে যাবে অর্থাৎ ভালোবাসা হবে। কিন্তু এই ভালোবাসাতে “বাগড়া” দিতে আসবেন নায়ক নায়িকার অর্থনৈতিক অবস্থান, অথবা দুইজনের পরিবারের ঝগড়া অথবা তৃতীয় কোন মানুষ যাকে আমরা “ভিলেন” ডেকে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলব আর নায়কের হাতে তার তুলোধোনা অবস্থা দেখে হাততালি দেব- বাংলা সিনেমার জন্য এই ফর্মুলাটা যেন একদম কমন- সেটা যতই “ব্যতিক্রমধর্মী” সিনেমা হোক না কেন! কিন্তু প্রথম দিকের কথার সাথে মিল থাকলেও, পরের অংশের কথার সাথে কোন মিল নেই নিয়তি সিনেমার। কারণ নিয়তি সিনেমার নায়ক হচ্ছেন এর গল্প, আর ভিলেন হচ্ছেন নিয়তি বা ভাগ্য। এখানেই নিয়তি সিনেমাটা বাকি বাংলা সিনেমা থেকে খানিকটা আলাদা।

কাহিনী সংক্ষেপঃ শহুরে এক ব্যবসায়ীর মেয়ে মিলাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে, যে কিনা ঘটনাচক্রে শুভ্র গ্রুপ অব কোম্পানির একমাত্র উত্তরাধিকার শুভ্র চৌধুরীর (আরেফিন শুভ) গাড়ির কাচ ভেঙে পালিয়ে যেতে গিয়ে হাতে নাতে ধরা পড়ে যায়। পরে গাড়ির কাচ ভাঙার ক্ষতিপূরণ হিসেবে মিলার কাছে পঞ্চাশ হাজার টাকা চায় শুভ্র। তবে মিলার বাবা খুবই কৃপণ, তাই বাধ্য হয়ে এক মাস শুভ্রর গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে চাকরী করে ক্ষতিপূরণ শোধ করার প্রস্তাবে রাজী হয় সে।

সিনেমার প্রথমাংশ দর্শকদের যোগাবে হাসির খোরাক; সেইসঙ্গে শুভ-জলির চমৎকার রসায়ন নজর কাড়তে বাধ্য। কিন্তু দ্রুতই গল্পের মোড় ঘুরে যায় দর্শককে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো একটি ঘটনায়।

তবে দর্শকদের জন্য প্রথম ধাক্কাটা আসে ফার্স্ট হাফ শেষ হওয়ার একটু আগে যেটার জন্য হয়তো আপনি প্রস্তুত ছিলেন না। দুইজনের মাঝে সবকিছু ঠিকঠাক থাকার পরেও নিয়তি বা ভাগ্য তাদের আলাদা করে দিল। চার বছর পরে আবার তাদের দেখা, কিন্তু ততদিনে পানি গড়িয়েছে আরও অনেকদূর! এরপরেও দুইজনের আবার চেষ্টা- একসাথে থাকার আর একসাথে বাঁচার। কিন্তু নিয়তি কি এবার সহায় হবে নাকি…?

চিত্রনাট্য: ‘নিয়তি’ একটি গল্পনির্ভর ছবি। গল্পই এ ছবির প্রাণ। ছবির কাহিনি ও চিত্রনাট্য- দুটোই লিখেছেন আবদুল্লাহ জহির বাবু। যদিও মূল গল্প মার্কিন সিনেমা ‘দ্য নোটবুক’ দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে ছবির শুরুতে দেখানো হয়েছে। তবে কাহিনি অনুকরণে যথেষ্ট স্বকীয়তার প্রমাণ দিয়েছেন চিত্রনাট্যকার। মূল ছবির অন্ধ অনুকরণের দেশীয় প্রবণতার বাইরে গিয়ে মানানসই চিত্রনাট্য তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।

ছবির সব চেয়ে শক্তিশালি দিক হল- গল্পের নতুনত্ব। তবে এই গল্পও আরেকটু গুছিয়ে বলা সম্ভব ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য আরো গোছানো হওয়া দরকার ছিলো। শেষের দিকে ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটতে থাকে, ফলে অনেক জায়গায় খেই হারিয়ে ফেলতে হয়েছে। এছাড়াও মিলার চার বছর ‘কোমা’তে থাকার ঘটনাটিও আরেকটু বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেখানো সম্ভব ছিল। তবে পুরো ছবিতে শুভ-জলির চমৎকার পর্দা-রসায়ন এবং গল্পের গভীরতা চিত্র্যনাট্যের দুর্বালতা অনেকটুকুই পুষিয়ে দিয়েছে।

পরিচালনাঃ পরিচালক হিসেবে জাকির হোসেন রাজু ইতিমধ্যেই তার যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। “নিয়তি” সিনেমাটিতেও তিনি তার নামের প্রতি সুবিচার করতে পেরেছেন এতে কোন সন্দেহ নেই। একজন পরিচালক হিসেবে এই সিনেমায় তার সবচেয়ে বড় উপহার গল্পের উপস্থাপনায় দর্শকদের ধরে রাখার ক্ষমতা। সিনেমার নামকরণের সার্থকতার জন্যও ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখেন এই গুণী পরিচালক। এই সিনেমার নাম নিয়তি ছাড়া আর অন্য কিছু হলে মানাত না। যেখানে পরিচালকের আসলে বসে আছেন শ্রদ্ধেয় জাকির হোসেন রাজু- সেখানে অবশ্য ভাল কিছু আশা না করাটাই পাপের পর্যায়ে পড়ে।

শিল্প নির্দেশনা ও চিত্রগ্রহণঃ ছবির শিল্প নির্দেশনা ও রূপসজ্জার কাজ ছিল বেশ উন্নত। শেষ দৃশ্যে মিলার রেপ্লিকাগুলো বেশ জীবন্ত বলে মনে হয়েছে। এছাড়া অপারেশনের পর মিলার পুরো মাথায় ব্যান্ডেজের বিষয়টিও বেশ বাস্তবিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে বৃদ্ধ শুভ্র’র সাজ আরেকটু নিখুঁত হতেই পারত।

ছবির সেট ও লোকেশন নির্বাচনেও বিচক্ষণতার পরিচয় পা্ওয়া যায়। ছবির দৃশ্যধারণ ও লাইটের ব্যবহার ছিল যথোপযুক্ত। বিশেষ করে হাসপাতালের কোমা রুম থেকে বেরিয়ে আসার পরে রাতের বেলা শুভ্রর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মিলার অস্থির কাতরতার দৃশ্যধারণে যথেষ্ঠ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন চিত্রগ্রাহক সাইফুল শাহীন।

অভিনয়: জলির প্রথম সিনেমা অঙ্গার। অঙ্গারের সাথে নিয়তির জলির ব্যবধান জাস্ট আকাশ পাতাল! অঙ্গার এ তার অভিনয়ের পরিপক্ষতার অভাব অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন এই সম্ভাবনাময়ী অভিনেত্রী। তারপরও কিছু কিছু দৃশ্যে জলির অভিনয় বেশ দুর্বল বলে মনে হয়েছে। শেষের দিকে মানসিক রোগীর চরিত্রে তার অভিনয়ে বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি ছিল অনেকটাই। এছাড়াও ‘ডায়ালগ থ্রোয়িং’-এ বেশ কিছু ক্ষেত্রে তার কণ্ঠে অভিব্যক্তির ঘাটতি চোখে পড়েছে। তবে আকর্ষণীয় সাজে আধুনিক মেয়ের চরিত্রে এ ছবিতে বেশ মানিয়ে গেছেন তিনি।

অন্যদিকে আরিফিন শুভর অভিনয় ছিল এক কথায় অনবদ্য। সাজ-পোশাক, অভিব্যাক্তি ও অভিনয়- সব দিক দিয়েই সাবলীল ছিলেন তিনি। শুভ দিন দিন অভিনেতা হিসেবে আরও যোগ্য করছেন বিশেষ করে সিনেমার শেষের দিকে যা দেখালেন! সবসময় ডিফারেন্ট কিছু করার চেষ্টাই শুভকে বাকি সবার থেকে আলাদা করে রাখবে।

ছবির খলনায়ক আরমান পারভেজ মুরাদের অভিনয় ছিল প্রসংশনীয়। এছাড়া অনান্য কলাকুশলীদের অভিনয় ছিল চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সঙ্গীত ও অন্যান্যঃ এ ছবির সবচেয়ে বড় সম্পদ হল এর গানগুলো। ভারতীয় সংগীত পরিচালক স্যাভির সংগীতায়োজনে ছয়টি গানই ছিল এক কথায় অসাধারণ। বিশেষ করে নাচে-গানে ভরপুর ‘ঢাকাই শাড়ি’ ও ‘অনেক সাধনার পরে’ গানটির রিমেক ভার্সনে যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় পা্ওয়া গেছে।  রুনা লায়লার গাওয়া ‘যতন করে’ গানটিও ঘটনার প্রেক্ষাপটে ‘সিচুয়েশনাল সং’ হিসেবে বেশ সার্থক।

উপসংহারঃ এই সিনেমাতে আরেফিন শুভর বলা একটি সংলাপ সম্ভবত অনেকদিন মাথায় থাকবে-“ও যদি পাগলও হয়ে যায়, আমাকে চিনতে নাও পারে ,তাও ঐ পাগলটাকেই আমি ভালোবাসবো“- সত্যিকারের ভালোবাসার সংজ্ঞা সম্ভবত এটাই- মনের মানুষ ঠিক যেরকম আছে, সেটা ভাল হোক বা মন্দ- সবসময় তার পাশে থাকা এবং তাকে সাহস দেয়াটাই সম্ভবত ভালোবাসা। অবশ্য যেই জেনারেশনের বেশিরভাগ সদস্য এখন জামার মতো মনের মানুষ দুইদিন পর পর চেঞ্জ করে, তাদের মাথায় শুভর বলা এই সংলাপ কতটা নাড়া দিবে-সেটা জানা নাই!

Comments

comments

Leave a Reply

Scroll To Top
0