ফেসবুকে ভক্তের আধিক্যঃ হলে দর্শক নেই

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক বহুল জনপ্রিয়। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মিডিয়ার তারকাদের মধ্যেও এ মাধ্যমটি নিয়ে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি লক্ষ্য করা যায়। এ মাধ্যমে কারও কারও জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। বিশেষ করে সিনেমার নায়িকাদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি একটু বেশি লক্ষণীয়। ফেসবুকে কারও কারও ভক্তের সংখ্য ৭০ লাখেরও বেশি। কিন্তু সিনেমা হলে তাদের ছবি দর্শক দেখেন না। কেন? বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে। লিখেছেন এফ আই দীপু।

বাংলাদেশে ফেসবুকের ব্যবহার এখন দৈনন্দিন কার্যক্রমের একটি বিশেষ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। সকালে ঘুম থেকে জেগে কিংবা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফেসবুকে চেকইন না দিলে যেন দিনটাই অপূর্ণ থেকে যায়। তরুণদের এই প্রবণতাকে টার্গেট করে মিডিয়ার তারকারাও মাঠে নেমেছেন। তারকাদের প্রায় সবাই ফেসবুকে সরব। আগে খবরের কাগজে প্রিয় তারকার আপডেট তথ্য সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে পাঠক-ভক্তরা পেয়ে থাকলেও সে দায়িত্ব অনেকাংশে এখন তারকারা নিজেরাই পালন করেন ফেসবুকের মাধ্যমে। বিষয়টি ইতিবাচক। এতে করে তারকাদের পরিচিত বাড়ছে আগের চেয়ে বেশি। বিষয়টি বরং একটু দ্রুতই হচ্ছে। সিনেমার নায়িকারা আবার এ পরিচিতিতে একটু বেশি এগিয়ে। তারা ফেসবুকে নিজেদের অ্যাকাউন্ট কিংবা পেজ খুলে ভক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন নিত্য। ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর পর্যন্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার রয়েছে চিত্রনায়িকা পরীমণির। ফ্যানপেজে তার ফলোয়ারের সংখ্যা ৭৩ লাখেরও বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন নুসরাত ফারিয়া। তার ফলোয়ারের সংখ্যা ৬৪ লাখেরও বেশি। অন্যদিকে বিদ্যা সিনহা মিমের ফলোয়ার রয়েছেন ২৩ লাখের বেশি। এদিক থেকে নায়ক হিসেবে শাকিব খান একটু পিছিয়ে রয়েছেন। তার ফলোয়ার ২১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ জন। নুসরাত ইমরোজ তিশা টিভি পর্দা থেকে সিনেমায় নাম লিখিয়েছেন। মাস দুয়েক আগে তিনি ফ্যানপেজ খুলেছেন। সেখানে তার ফলোয়ার রয়েছেন ৭ লাখ ১১ হাজার ৩৩৫ জন এবং লাইকার ৭ লাখ ১২ হাজার ৭৬০ জন। মাহিয়া মাহির ফ্যানপেজে ফলোয়ার ৮ লাখের একটু বেশি। অন্যদিকে চিত্রনায়িকা আঁচলের ফ্যানপেজে ফলোয়ারের সংখ্যা ৩৯ হাজারেরও বেশি।

দেশের আলোচিত চিত্রনায়িকাদের বিশাল এই ফলোয়ার-কাম ভক্তের সংখ্যা দেখেই বোঝা যায় তারা কতটা জনপ্রিয়। কিন্তু পাহাড়সম জনপ্রিয়তার মধ্যে অনেক নায়িকার ছবি ফ্লপ! দর্শক নেই সিনেমা হলে। ছবি মুক্তির আগে ব্যাপক প্রচারণা সত্ত্বেও দর্শকের আগ্রহ জন্মে না। সাধারণ দর্শকদের কথা বাদ দিলেও ফেসবুকে ফলোকৃত ভক্তরা তাদের ছবি দেখেন না! কিন্তু কেন? একজন ফলোয়ার নিশ্চয়ই তার প্রিয় তারকার প্রতি আগ্রহ রয়েছে বলেই তাতে ফলো করেন। তাহলে কেন সেই প্রিয় তারকার ছবি দেখতে সিনেমা হলে যাবেন না। এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীমণি ও নুসরাত ফারিয়ার যে পরিমাণ ফলোয়ার-কাম ভক্ত রয়েছেন তাতে করে তার অর্ধেকও যদি সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখত তাহলে বাজেটের তিনগুণ অর্থ প্রযোজক ফেরত পেতেন। ছবি হতো বাম্পারহিট। হিসাবটা এভাবেই কষা যাক। নুসরাত ফারিয়ার ফলোয়ার কিংবা লাইকারের সংখ্যা ৭০ লাখেরও বেশি। এদের প্রায় ৯০ ভাগ বাংলাদেশেই বসবাস করেন। এই ৭০ লাখের মধ্যে যদি ৩৫ লাখ ভক্ত তার অভিনীত সিনেমা দেখতে হলে যেতেন তাহলে একবার ভাবুন সেই ছবির অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াত। বিষয়টি আরও একটু পরিষ্কার করা যাক। যদি নুসরাত ফারিয়া অভিনীত একটি ছবির বাজেট ২ কোটি টাকা হয়, তার ভক্তের মধ্যে ৩৫ লাখ সিনেমা দেখতে হলে যেতেন, তাহলে প্রতি টিকিটের দাম গড়ে ৫০ টাকা করে সেই ছবির টিকিট বিক্রি হতো ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা! আচ্ছা, এতটুকুর দরকার নেই। ভক্তের মধ্যে যদি ২০ শতাংশ সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখতেন তাহলে সেই ছবির টিকিট বিক্রি হতো ৭ কোটি টাকা! বিষয়টি ভাবা যায়! একজন নায়িকার মাত্র ২০ শতাংশ ভক্তের সিনেমা হলে উপস্থিতিই বদলে দিতে পারত বাংলাদেশী সিনে ইন্ডাস্ট্রির ভাগ্য। কিন্তু এটা কেবলই পরিসংখ্যান। আদপে এরকম কিছুই ঘটার সম্ভাবনা নেই। নায়িকাদের ফলোয়ার কিংবা ভক্তের আহ্লাদিপনা শুধু ফেসবুকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর তারকারাও ফেসবুকে ভক্তের সংখ্যা গুনে আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন। নিজেদের জনপ্রিয়তা মাপেন। অর্ন্তজালের হিসাব বুকে বেঁধে বাইরের দুনিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করেন তারা কতটা জনপ্রিয়! একবারও তাদের মনে হয় না কীভাবে এই বিশাল ভক্তকে সিনেমা দেখতে হলে নিয়ে যাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে ঢাকাই ছবির অর্ন্তজাল দুনিয়ায় জনপ্রিয় কয়েকজন নায়িকার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। কেন ফেসবুকে আপনাদের বিশাল অংকের ফলোয়াররা আপনার অভিনীত ছবি দেখতে হলে যান না। এ প্রসঙ্গে নুসরাত বলেন, ‘ফেসবুক হল বর্তমান সময়ের অন্যতম একটি যোগাযোগ ও প্রচার মাধ্যম। প্রযুক্তির এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের এগিয়ে না নিলে আমরা পিছিয়ে পড়ব। ফেসবুকে ফ্যানপেজের মাধ্যমে সবসময় নিজেদের কাজের আপডেট দিতে পারছি। দর্শকরা জানতে পারছে আমরা কী করছি। প্রিয় তারকার ভালোলাগা-মন্দলাগার বিষয়গুলো জানতে পারছেন তারা। ফলোয়ার হওয়া মানেই তো আমার সব কাজের সমর্থন দেয়া নয়। আমরা কী করছি সেটা তাদের নজরে রাখা। আমরা কেমন পোশাক পরছি, কী হেয়ার স্টাইল করছি সে বিষয়ে খোঁজ রাখা। তবে সব ফলোয়ার একই রকম নয়। অনেকেই আছেন যারা পেজ থেকে জানতে পারেন কবে আমাদের ছবি মুক্তি পাচ্ছে। তারা ছবিটি দেখতে যান এবং ইনবক্সে বিষয়টি জানান। যা আমার জন্য পজেটিভ একটি বিষয়।’

বিষয়টি নিয়ে বিদ্যা সিনহা মিম বলেন, ‘আমরা দর্শক-ভক্তদের জন্যই অভিনয় করি। তারা যদি মুখ ঘুরিয়ে থাকেন তাহলে আমাদের কাজের কোন মূল্য নেই। আর ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দর্শক ভক্তদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগটা ভালো হয়। আমাদের নানা বিষয়ে তারা খোঁজ-খবর জানতে পারেন। আমাদের কাজের আপডেট তাদের জানাতে পারি আমরা। এখানে সবাই কিন্তু সেই রকম ভক্ত নন। নানা ধরনের ফলোয়ার রয়েছেন। কেউ ছবি দেখতে পছন্দ করেন, কেউ আমাদের কর্মকাণ্ডের আপডেট রাখতে ভালোবাসেন, কেউ আবার এখানে ছবির পোস্টার দেখে আমাদের মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি দেখতে যান। ফলোয়ারদের সবাই যে প্রেক্ষাগৃহে যাবেন এমন কোনো নিয়ম নেই। তারা আমাদের ভালোবাসেন তার জন্যই কোনো এক মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।’ চিত্রনায়িকা আঁচল বলেন, ‘আমি তো ফেসবুকে অতটা অ্যাকটিভ না। আমার ফ্যানপেজও নেই। ফ্যান না থাকলে কী হবে! ভক্তরা ভালোবেসে একাধিক ফ্যানপেজ খুলে নিজেদের মতো করে চালাচ্ছেন। তবে যে অ্যাকাউন্ট রয়েছে তাতে মাঝে মাঝে কাজের আপডেট দেই। ভালোলাগা-মন্দলাগার বিষয়টা শেয়ার করি। এতে অনেক ফলোয়ার ও ভক্ত কমেন্ট করেন। কাজের প্রশংসা করেন। যা থেকে কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়ে। তবে ফেসবুকে যারা আমাকে ফলো করেন বা আমার ভক্ত বলে বলে দাবি করেন তারা হলে আমার ছবি দেখতে যান কিনা জানি না। গেলে ভালো হতো। আমাদের প্রতি তাদের ভালোবাসা আরও গভীরভাবে প্রকাশ পেত। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পটাও আরও চাঙ্গা হতো।’

চিত্রনায়িকারা নিজেদের পক্ষে মন্তব্য করলেও ফেসবুকের ফলোয়ার কাম ভক্তের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিনিয়র পরিচালক বলেছেন, ‘প্রযুক্তির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে হয়তো সেলিব্রেটিরাও নিজেদের সাধারণ জনগনের সঙ্গে মিশিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু তারা ভুলেও টের পাচ্ছেন না, এতে করে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। সহজে এবং বিনা পয়সায় কিছু পেয়ে গেলে সেটা মানুষ কেন টাকা দিয়ে কষ্ট করে কিনতে যাবে বা দেখতে যাবে। তাদের বেলায়ও ঠিক তা-ই হচ্ছে। নিজেদের যখন তখন ফেসবুকে উপস্থাপনের কারণেই হলে গিয়ে আর দর্শকরা তাদের দেখতে চাইছেন না। তবে তাদের উচিৎ, এত বিশাল অংকের ভক্তদের বোঝানো, যাতে হলে গিয়ে সিনেমা দেখেন। তাহলে তারা নিজেরাও বাঁচবেন এবং ইন্ডাস্ট্রিও বাঁচবে।’

শবনম বুবলী

ফেসবুক ফলোয়ারঃ ৭ হাজার ৮৬২

খুব বেশিদিন হয়নি ইন্ডাস্ট্রিতে অভিষেক ঘটেছে চিত্রনায়িকা শবনম বুবলির। ফেসবুকেও ততটা সরব নন। তবে ইদানীং সবর হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইন্ডাস্ট্রিতে একেবারেই নতুন আমি। তবুও এ অল্পসময়ে দর্শকদের দারুণ ভালোবাসা পাচ্ছি। ফেসবুকেও বাড়ছে ফলোয়ারের সংখ্যা। নিজের কাজের আপডেট জানাচ্ছি। দর্শক ফলোয়ার সেখানে কমেন্ট করে উৎসাহ দিচ্ছেন। বিষয়টি ভালোই লাগে আমার। তবে তারা মূলত তাদের পছন্দের তারকাদের কাছাকাছি থাকার জন্যই ফেসবুকে ফলোয়ার হন। প্রিয় তারকাদের স্ট্যাটাস পড়ে, তাদের সুন্দর সুন্দর ছবি দেখে আনন্দ নেয়ার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে অনেকেই আবার প্রেক্ষাগৃহমুখী হন। তাই এতে নেতিবাচকের থেকে ইতিবাচক দিকটিই বেশি মনে করি আমি।

মাহিয়া মাহি

ফেসবুক ফলোয়ারঃ ৮ লাখ ২৯ হাজার ৯৯১ জন

লাইকারঃ ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৯৮৪ জন

এ তথ্য রয়েছে মাহির ফেসবুক কর্তৃক ভেরিফাইড পেজে। তার প্রতি পোস্টে ৪ থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত লাইক দেখা যায়

আঁচল

ফেসবুক ফলোয়ারঃ ৩৯ হাজার ৬৭৬ জন

লাইকারঃ ৪০ হাজার ৮৩ জন

এ তথ্য আঁচলের ফ্যানপেজ দেয়া আছে। তার দেয়া প্রতি পোস্টে গড়ে ১ হাজার লাইক দেখা যায়।

পরিমনী

ফেসবুক ফলোয়ারঃ ৭৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৮ জন

লাইকারঃ ৭০ লাখ ৫০ হাজার ২২২ জন

এ তথ্য রয়েছে পরিমনীর ফেসবুক কর্তৃক ভেরিফাইড পেজে। পোস্টে গড়ে ১৫ হাজার লাইক দেখা যায় প্রতি পোস্টে।

নুসরাত ফারিয়া

ফেসবুক ফলোয়ারঃ ৬৪ লাখ ৬৫ হাজার ৩৮ জন

লাইকারঃ ৬৪ লাখ ৯২ হাজার ৪০৭ জন

এ তথ্য রয়েছে নুসরাত ফারিয়ার ফেসবুক কর্তৃক ভেরিফাইড পেজে। গড়ে ৩৫ হাজার লাইক দেখা যায় তার প্রতি পোস্টে।

বিদ্যা সিনহা মিম

ফেসবুক ফলোয়ারঃ ২৩ লাখ ২২ হাজার ৫৪ জন

লাইকারঃ ২৩ লাখ ৪০ হাজার ৬৫৯ জন

এ তথ্য রয়েছে মিমের ফেসবুক কর্তৃক ভেরিফাইড পেজে। তার প্রতি পোস্টে ৫ থেকে ২৫ হাজার পর্যন্ত লাইক দেখা যায়

Comments

comments

Scroll To Top