বছর শেষের হিসাবনিকাশঃ কেন আলোচনায় নেই ‘মুসাফির’?

২০১৬ সালে বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে সব মিলিয়ে ৫৭টি ছবি। এরমধ্যে বাণিজ্য সফল বা আর্থিক আয়ের দিক থেকে সিনেমার সংখ্যা খুবই সামান্য। এমনকি বেশীর ভাগ ছবিই নির্মাণ ব্যয়ই তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে হল রিপোর্ট আর অনুমান নির্ভরশীলতার উপর ভিত্তি করে অমিতাভ রেজার আয়নাবাজি’কে ২০১৬ সালের সবচেয়ে বেশী আয় করা সিনেমা বলা হলেও, সর্বোচ্চ আয় করে প্রথম স্থানটি জিতের ‘বাদশা’র দখলে বলে জানায় জাজ মাল্টিমিডিয়া। আর এমন র‌্যাঙ্কিংয়ে কিছুটা ক্ষুব্ধ ‘মুসাফির’ খ্যাত জনপ্রিয় নির্মাতা আশিকুর রহমান।

সম্প্রতি ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া ঢাকাই চলচ্চিত্রগুলো নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। বিশেষ করে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর বাণিজ্যের দিকটিই বেশী আলোচিত হতে দেখা যাচ্ছে। সেই আলোচনায় সম্প্রতি যেন ঘিঁ ঢেলে দিল দেশের অন্যতম সিনেমা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া।

জাজের হিসেব মতো সাধারণ দর্শক যে সিনেমাগুলোকে সবচেয়ে বাণিজ্যসফল বলে মনে করছে, সেই অনুমান সঠিক নয় দাবী করে নিজেরাই বাণিজ্যসফল ছবির তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে তালিকায় ছয়টি সিনেমার নাম নেয়া হয়। যারমধ্যে জাজ মাল্টিমিডিয়ার ছবিই স্থান পায় চারটি।

সঠিক হিসেব শুধু জাজের কাছেই আছে দাবী করে জাজ জানায়, প্রতিটা সিনেমা হলের প্রতি শো এর সেলের হিসাব সবার আগে আসে জাজ এর কাছে । সেই আলোকে ২০১৬ সালের ১০০% সঠিক তথ্য তুলে ধরছি সবার জন্য। এই তথ্য শুধুমাত্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সিনেমা হলের সেলের উপর ভিত্তি করে, এখানে কোন সিনেমার বহির্বিশ্বের সেল যোগ করা হয়নি। বক্স অফিসের সেল অনুযায়ী ক্রমান্বয়ে সিনেমার নাম দেওয়া হল।

তারপর একেএকে জিতের বাদশা, শাকিবের শিকারি, চঞ্চলের আয়নাবাজি, শাকিবের বসগিরি, শুভ’র নিয়তি এবং পরীমণির রক্ত’র নাম নেয়া হয়। আর এমন তালিকা প্রকাশের পর সমালোচনার মুখে পড়ে জাজ। অনেক নির্মাতা ও সিনেবোদ্ধা জাজের তালিকাকে সঠিক নয়, বরং মনগড়া বলে মন্তব্য করেছেন। আর নিজের নির্মাণে ‘মুসাফির’কে বাণিজ্যসফল ছবির তালিকায় না দেখে কিছুটা ক্ষোভ দেখা যায় নির্মাতা আশিকুর রহমানের মনেও!

আর তাই জাজের প্রকাশিত ব্যবসাসফল ছবির তালিকাকে মনগড়া ইঙ্গিত দিয়ে আশিকুর রহমান বলেন, ‘মুসাফিরের পুরো বাজেট ১ কোটির থেকে একটু কম/বেশী। মুসাফিরের টিভি রাইটস, ইউটিউব কনটেন্ট, গান ইত্যাদি থেকে মূল বাজেটের ২০% কাভার হয়েছে মুসাফির রিলিজের আগেই। মুসাফির মুক্তির প্রথম সপ্তাহে খরচ বাদে মূল বাজেটের ৪৫% কাভার হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২, ৩, ৪ সহ অন্যান্য সপ্তাহে আরও ৪০% কাভার হয়ে যায়। সব মিলিয়ে মোটামুটি ২ মাসের মাথায় মুসাফিরের বাজেট উঠে যায়। মুসাফির রিলিজ হয়েছিলো ২২ই এপ্রিল। গত মাসেও মুসাফির বেশ কয়েকটা হলে চলেছে। প্রতি মাসেই ৪-৫ টা হল এ মুসাফির চলে। সামনে আরও কয়েকটা টা হল এ চলার সম্ভাবনা আছে।

উপরের হিসাব নিকাশ থেকে যেকোনো সাধারণ মানুষ মুসাফিরের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা করতে পারবেন আসা করি। বিজনেসের প্রতি আস্থা ও মানি রিকভারির প্ল্যান শক্ত রেখেই আমরা মুসাফির-২ এর ঘোষণা দিয়েছিলাম। খুব শিঘ্রি হয়তোবা কাজও শুরু করবো।’

যারা মনগড়া বাণিজ্যসফল ছবির র‌্যাঙ্কিং করছেন তাদের প্রতি দৃষ্টি রেখে এবং নিজেকে বাণিজ্যসফল ছবির নির্মাতা দাবী করে আশিকুর আরো বলেন, বছরের শেষ দিকে অনেকেই নিজেদের স্বার্থ ঠিক রেখে নিজেদের মত মন্তব্য করেছেন, নিজেদের মত নিজেরা সিনেমার র‌্যাঙ্কিং দিয়েছেন। সেটা তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। একটা পত্রিকায় দেখলাম, ২০১৬ সালের আলোচিত নির্মাতার মধ্যে এমন একজনের নাম, যার কোন সিনেমাই মুক্তি পায়নি, তারপরও সে আলোচিত। কি কি কাজ করলে আসলে আলোচিত হওয়া যায় আমি জানি না। জানি না বলেই নিজের ঢোল নিজে বাজিয়ে বলতে পারি না, মুসাফির দর্শকদের মতে বছরের অন্যতম সেরা ছবি হওয়ার পর ও আলোচিত নির্মাতা আমি না কেন, বাণিজ্যিক বাংলা মুভি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতে এখন যাচ্ছে। আমাদের বানানো মুভি দেশের বাইরে রিলিজ হচ্ছে, বিভিন্ন দেশের ফিল্ম ক্রুরা বাংলা মুভিতে কাজ করছে, তার পরও আমরা আলোচিত না।

কিছুটা মনোকষ্ট নিয়েই মুসাফির নির্মাতা জানান, দেশের প্রথম মিউজিক্যাল ফিল্ম সেন্সর পেলো, প্রথম ইউটিউব এ কোটি ঘর স্পর্শ করা নির্মাতা হয়েও আমি আলোচিত না। ৭ মিলিওন ভিউর একটা ভিডিওতে ডিরেক্টর হিসাবে সব কাজ করেও ডিরেক্টরের নাম আমার না। কারণ পার্শ্ববর্তী দেশের কোরিওগ্রাফার এর নাম ডিরেক্টর হিসাবে দিলে নাকি আলোচিত বেশী হবে। এই অদ্ভুত আলোচিত হওয়ার পন্থাগুলো আমি আসলেই জানি না। আমার জানার আগ্রহও নেই। কারণ আলোচিত হয়ে নাম কামানো সেলিব্রিটি হতে আমি আসি নি। আমার স্বপ্ন অনেক ভিন্ন, অনেক বড়। রাত দিন চেষ্টা শুধু সেই স্বপ্ন টাকে সত্যি করার।

তবে মিডিয়ায় আলোচিত না হলেও আফসোস নেই জানিয়ে এ নির্মাতা আরো বলেন, রাস্তা ঘাটে হুট করে যখন অপরিচিত দুই একজন সেলফি তুলে তাদের ভালোবাসার কথা জানায়, মুসাফিরকে ভালো লাগার কথা জানায়, মার্কেটের ভিতর হঠাৎ করে ছুটে আসে মুসাফিরের গানের শব্দ, তখন অন্য কারো রিকগনিশন এর দরকার পরে না। হলের ভিতর যখন মুসাফির এর ডায়লগ মানুষ বলতে থাকে, মুসাফিরের চরিত্র গুলোকে মানুষ আপন করে নেয়, হাজার দর্শক মুসাফির দেখে, তখন আর আলোচিত হওয়ার দরকার পরে না। অন্যের কাছে নিজের পরীক্ষা দেয়ার দরকার পরে না। দর্শকের ভালোবাসাই সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দেয়। জবাব দিলে আমি নিজের বিবেকের কাছেই দিবো, আর কারো কাছে না।

Comments

comments

Leave a Reply

Scroll To Top