বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিবৃত্তিঃ সময়ের দর্প্নে!

পৃথিবীর নবীনতম শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্র, যার বয়স এক শ বছরের একটু বেশি। আর যদি চিত্রকলার কথা বলি কিংবা নাট্যকলার কথা বলি, তার জন্ম প্রায় মানুষের জন্মের বয়সের সমসাময়িক।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নবীনতম চলচ্চিত্রশিল্প-মাধ্যমটির অভিঘাত মানবসমাজে এত প্রবল যে এর সঠিক ব্যবহার একটা জনগোষ্ঠীর মধ্য সুদূরপ্রসারী আচরণগত পরিবর্তন এনে দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, আমাদের কৈশোরে দেখেছি, সত্যজিৎ রায়ের নায়কেরা প্রায় সবাই ধূমপান করেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই নায়কোচিত ধূমপানের প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত হয়ে পড়ি। আমাদের প্রথম বয়সে ধূমপান ছিল পুরুষ হয়ে ওঠার অন্যতম হাতিয়ার। এ তো গেল ব্যক্তিমানুষের প্রতি সিনেমার অভিঘাত-সামষ্টিক মানুষের ওপর সিনেমার প্রভাবের উদাহরণ দেওয়ার জন্য আমাদের জহির রায়হানের সাহেবই যথেষ্ট।

ধরি তাঁর জীবন থেকে নেয়া উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সমসাময়িক ছবিটা বাঙালির মানসপটে অভূতপূর্ব নাড়া দিয়ে যায়। একাত্তর বিনির্মাণে কী দারুণ সাহস জোগায়। শহীদ মিনারের সামনে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়, শিরদাঁড়ায় শিরশিরে অনুভূতি হয়, চোখ ভিজে আসে। রবীন্দ্রনাথের এই গানটি তখন তো আমাদের জাতীয় সংগীত ছিল না। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে আমরা ‘আমার সোনার বাংলাকে’ পেয়ে যাই।

শিকড়ের সন্ধানে এই কথাটির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের কল্যাণে। তাঁর কীত্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল, হাত হদাই এই নাট্যত্রয়ী।

লেবেদেফ সাহেবের (বাংলা প্রসেনিয়ম থিয়েটারের প্রবর্তক, রুশীয় ভদ্রলোক) তিন শ/চার শ বছরের থিয়েটারি ইতিহাসের বিপরীতে হাজার বছরের বাংলা নাট্যের ইতিহাসের কথা বলে নানা দেশজ আঙ্গিকের সারাৎসার আমরা চোখের সামনে দেখতে পাই। বাংলা চলচ্চিত্রেও শিকড়ের সন্ধানের প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পাই ষাটের দশকে, উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি ও ভারতীয় বাংলা সিনেমার দাপটের বিপরীতে এই বঙ্গদেশে জহির রায়হান নির্মাণ করেন বেহুলা, যা এ জাতির শিকড়ের কাহিনি…জাতি সে সময়ে নড়েচড়ে বসে। সাত ভাই চম্পা, অরুণ বরুণ কিরণমালা, রূপবান। তথ্যপ্রযুক্তি নেই এমন সময়ে বাংলার ঘরে ঘরে রূপবান ছবির গান গীত হতো। বাড়ির ও না দক্ষিণ পাশে গো, ও দাইমা কিসের বাদ্য বাজে রে।

পরবর্তীকালে আমি যখন কাজল রেখা নির্মাণের প্রচেষ্টা হাতে নিই। (প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে) দীনেশ চন্দ্র সেনের এই কথাগুলো আমার বড় ভালো লাগে—পাঠককে তাঁর কথাগুলো বলার লোভ সামলাতে পারলাম না, মার্জনা করবেন। তাঁর ভাষাতেই বলি, ‘পাড়া গাঁয়ের এই সরল সরল কথা, যাহাতে সংস্কৃতের এতটুকুও ধার করা শোভা নাই, যাহা নিজ স্বাভাবিক রূপে অপূর্ব সুন্দর। তাহার নমুনা আমরা কোথায় পাইতাম। নানা দিক দিয়া এই সকল পল্লীগাঁথায় খাঁটি বাঙ্গালী জীবনের অফুরন্ত সুধা, অচিন্তিতপূর্ব মাধুর্য্য ঝরিয়া পড়িতেছে। ইহা স্বর্গ হইতে আহূত অমৃতভান্ড নহে, ইহা আমাদের দেশের আম গাছের মৌচাক। এ জন্য এই খাঁটি মধুর আস্বাদ আমাদের নিকট এত ভালো লাগিয়াছে।’

২০১৩ সালের প্রথম ভাগে বাংলা চলচ্চিত্রের এক নবজোয়ার লক্ষ করছি। ডিজিটাল প্রজেকশনের কিঞ্চিৎ সুবিধা হওয়ায় ডিজিটাল ফরমেটে ছবি তোলার ধুম পড়েছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে নতুন সিনেমা শুরু হচ্ছে। মহরত হচ্ছে। গান হচ্ছে। সাকিব খান হাতিরঝিলে শুটিং করছেন। চারদিকে সাড়া পড়ে যাচ্ছে। শুনতে পাই ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রচেষ্টায় দুই শত নতুন থিয়েটার বিনির্মাণ করা হবে। দুই দেশের চলচ্চিত্র বিনিময় শুরু হবে। নতুন দিনের সুবাতাস নাকে এসে লাগছে। আবার ভয়ও হয় আমাদের এই প্রচেষ্টা আমরা অব্যাহত রাখতে পারব তো? শক্তিশালী পুঁজির সঙ্গে আমরা যুততে পারব তো? সিনেমা নিয়ে আরও একটি ভয়ের কথা বলি। বর্তমান সময়ে যা যা চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব কটি প্রজেক্টে ‘লো বাজেট লো বাজেট’ একটা রব শোনা যাচ্ছে। যে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হবে, তার জন্য কত বাজেট লাগবে, নাকি কাট ইউর কোট অ্যাকর্ডিং টু ইউর ক্লথ—এই ভঙ্গিতে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হবে, এটা বোধ হয় ভেবে দেখার। খতিয়ে দেখার সময় এসেছে।

ধরলাম, আমরা ২০১৩-১৪ সালের মধ্যে বেশ কটি নতুন প্রাণবন্ত চলচ্চিত্র পেয়ে গেলাম। তখন তার বিপণন, প্রদর্শনী এবং লগ্নিকারকের টাকা ফেরত পাওয়ার বর্তমান প্রক্রিয়াটা কী অবস্থায় আছে, তার একটা পর্যালোচনা দরকার। লগ্নিকারকের টাকা সাধারণত ফিরে আসে টিকিট বিক্রির টাকার হিস্যা থেকে। সাধারণ সিনেমা হলগুলো থেকে ন্যায্য হারে হিস্যা পেতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না। কিন্তু নামীদামি সিনেমা হলগুলোর হিসাব আলাদা। ধরি চালার রজনীগন্ধা সিনেমা হল ২০ টাকায় যদি একটা টিকিট বিক্রি করে, তাহলে সে প্রডিউসারকে প্রথম সপ্তাহে ৫০% অর্থাৎ ১০ টাকা দিয়ে দেয়। তার বিপরীতে অভিজাত সিনেমা হলে যদি টিকিটের মূল্য ২০০ টাকা হয়, প্রডিউসার পায় ৪০ টাকার বেশি নয়। এ ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি, তারা এসি চালায়, আরামদায়ক পরিষ্কার আসনের ব্যবস্থা করেছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য সুন্দর পরিবেশের আয়োজন করেছে। খুব যৌক্তিক কথা। কিন্তু পাশের দেশের বাংলা শহর কলকাতা, সেখানকার অভিজাত হলগুলো আমাদের অভিজাত হল থেকে ফেলনা কিছু নয়। তারা তো ঠিকই ৫০% শেয়ার মানি দিয়ে দিচ্ছে।
এ-সংক্রান্ত ন্যায্য নীতিমালা হলে ভালো সিনেমা হবে, ভালো সিনেমা, ভালো থিয়েটার গড়ে উঠবে। দর্শকও দলে দলে হলে যাবে। সামনে আছে শুভদিন।

আরেকটা কথা শুনতে পাই, ১৬ কোটির দেশে নাকি বাজার নেই। চারদিকে একই কথা—আমার এটা বিশ্বাসে লাগে না। সিনেমাটা যদি মানুষের মনে ধরে, সেই সিনেমা ব্যবসা করবেই।

কম বাজেট কম বাজেট করে টেলিভিশন নাটক যেমন ডুবতে বসেছে, তেমনি ডুবে থাকা সিনেমাটা আরও তলিয়ে যায়। আর বর্তমান সময়ের দিকে যদি একটু তাকাই, গত ৪২ বছরে আমাদের অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিকাশের সামঞ্জস্য নেই। ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ বিনির্মাণে থিয়েটারের যে ভূমিকা, চলচ্চিত্রের ভূমিকা সেই তুল্যে শূন্যের কোঠায়। আমরা তামিল সিনেমা, তেলেগু সিনেমা, মুম্বাই সিনেমার রেপ্লিকা করে যাচ্ছি দিনের পর দিন, কেন? নিজেদের দিকে একটু ফিরে তাকাই, এই মাটির দিকে তাকাই, আমাদের শহর, আমাদের গ্রাম, কত গল্প, কত জীবন। সিনেমার জয় হোক।

Comments

comments

Leave a Reply

Scroll To Top