মুভি রিভিউঃ পিঙ্ক (২০১৬)

চলচ্চিত্রের নামঃ পিঙ্ক (২০১৬) মুক্তিঃ ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০১৬ অভিনয়েঃ অমিতাভ বচ্চন, তাপসী পন্নু, কীর্তি কুলহারি, অ্যান্ড্রেয়া তারিয়াং, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। পরিচালনাঃ অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী প্রযোজনাঃ রাশমী শর্মা ফিল্মস ও রাইজিং সান ফিল্মস কাহিনিঃ অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী, সুজিত সির্কার ও রিতেশ শাহ্‌ চিত্রনাট্য ও সংলাপঃ রিতেশ শাহ্‌ সম্পাদনাঃ বদাদিত্য মুখার্জি চিত্রগ্রহনঃ অভিক মুখোপাধ্যায় সংগীতঃ অনুপম রয় এবং সান্তনু …

Review Overview

পরিচালনা
কাহিনী
চিত্র্যনাট্য
চিত্রগ্রহন
সম্পাদনা
অভিনয়

Summary : আসলে পিঙ্ক এমন একটি সিনেমা যা আমাদের সমাজে নারীর বিরুদ্ধে দ্বিমুখী আচরণের মুখোশ উম্মোচন করে। সিনেমাতে অভিনয় করা প্রত্যেক তারকার বাস্তবধর্মী অভিনয় আপনাকে তাক লাগিয়ে দিতে বাধ্য। এই সিনেমার বার্তাটা স্পষ্ট। নিজের শরীর, গোলাপি ঠোঁট, যোনির কমনীয়তা যেখানে অধিকার একমাত্র নারীরই। যদিও পুরুষ জাত্যাভিমানের চোটে নিজেদের অধিকারী মনে করে নেয়। দাবি চাপাতে থাকে। বোঝে না, মেয়েটি স্বেচ্ছায় রাজি না হলে ছেলেটির কোনও দাবিই ধোপে টিকবে না। সমসময়ের নিরিখে ‘পিঙ্ক’ ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রশ্ন একটাই। যাঁরা ছবিটা দেখবেন, সকলেই কি মানসিকতা বদলাতে পারবেন?

User Rating: 4.09 ( 4 votes)
90

চলচ্চিত্রের নামঃ পিঙ্ক (২০১৬)

মুক্তিঃ ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০১৬

অভিনয়েঃ অমিতাভ বচ্চন, তাপসী পন্নু, কীর্তি কুলহারি, অ্যান্ড্রেয়া তারিয়াং, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।

পরিচালনাঃ অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী

প্রযোজনাঃ রাশমী শর্মা ফিল্মস ও রাইজিং সান ফিল্মস

কাহিনিঃ অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী, সুজিত সির্কার ও রিতেশ শাহ্‌

চিত্রনাট্য ও সংলাপঃ রিতেশ শাহ্‌

সম্পাদনাঃ বদাদিত্য মুখার্জি

চিত্রগ্রহনঃ অভিক মুখোপাধ্যায়

সংগীতঃ অনুপম রয় এবং সান্তনু মিত্র

প্রারম্ভিক কথাঃ  কোনও মেয়ের ‘না’এর উপর জোর খাটানো যায় না। খাটাতে চাওয়াটা আসলে পৌরুষহীনতার প্রতীক। যেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীর ‘পিঙ্ক’। একা থাকা কয়েকজন মেয়ে ইচ্ছেমতো পোশাক পরে। নির্ভাবনায় ঘুরে বেড়ায়। মদ খায়। তার মানে এদের সহজে ‘পাওয়া’ যাবে। এই ‘অশিক্ষিত’ ভাবনাটাই স্পষ্ট গলায় নাকচ করে দেয় ‘পিঙ্ক’। যে বিষয়গুলো নিয়ে মেয়েদের প্রতিদিন জবাবদিহি করতে হয়, সেগুলোই জোরালোভাবে আছে ছবিতে। কিন্তু সাট্‌ল ভঙ্গিতে। অনেকদিন পর কোনও ছবির শেষে দর্শককে হল’এ থম মেরে বসে থাকতে দেখা গেল!

কাহিনী সংক্ষেপঃ মধ্যবিত্ত পরিবারের তিন চাকুরিরতা মহিলা- মিনাল, ফালাক আর আন্দ্রিয়া। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে তিন বন্ধুদের মধ্যে চলে হাসি-ঠাট্টা-গসিপ। একটি রক কনসার্টের পর সূরজকুন্ডের রিসর্টে প্রভাবশালী, হ্যান্ডসাম রাজীব ও তাঁর আরও দুই বন্ধুদের সঙ্গে ডিনারে যান তিন বান্ধবী। এখানেই গল্পের মোড় ঘুরে যায়। দু-চুমুক ড্রিঙ্কের পরই হাতছাড়া হয়ে যায় পরিস্থিতি। বেশকিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর, আন্দ্রিয়া বুঝতে পারেন, ডাম্পি (রাসূল ট্যান্ডন) আর রাজীব মিনালকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করছে। আন্দিয়া ঘোরের মধ্যেই মিনালের আর্তচিত্‍কার শুনতে পাচ্ছেন। কিন্তু উঠে তাঁকে যে সাহায্য করার ক্ষমতা নেই। আত্মসম্মান আর আব্রু রক্ষার তাগিদে আক্রমণকারীদের বোতল ছুড়ে মারেন মিনাল। চোখে আঙুল দিয়ে আঘাত করে সেই রিসর্ট ছেড়ে পালিয়ে বাঁচেন ওরা। রাতের ভয়ানক ঘটনাকে সঙ্গী করে বাড়ি ফেরেন তাঁরা।

এখান থেকে শুরু হয় গল্পের টেনশন। একপক্ষ পরিচিতি আর গায়ের জোরে শক্তিশালী। অন্যপক্ষের স্রেফ মনের জোর। গল্পের শুরুটা হয় এইভাবেই। কাহিনির জল গড়ায় বাস্তব আর সামাজিক পরিস্থিতিকে সঙ্গী করেই। খবরের কাগজ খুললেই যে যে ঘটনা আমাদের চোখে পড়ে, তার বাস্তিবক রূপ দিয়েছেন পরিচালক অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরী। অসাধারণ থ্রিলার ছবির মূল গল্পটা না বললেও অনেকেই আন্দাজ করে ফেলেছেন হয়তো। সঙ্গে জুটে যায় একটু ‘সনকি’ আইনজীবী দীপক সহগল। যে চরিত্রে রয়েছেন অমিতাভ।
ছবির দ্বিতীয়ার্ধের ঠিক আগে অমিতাভ আসেন। সেকেন্ড হাফ পুরো কোর্ট রুম ড্রামা। গোটা ছবি জুড়ে টেনশন জিইয়ে রেখেছিলেন অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী। যে ঘটনা নিয়ে গল্প, সেটা একবারও দেখাননি। এন্ড ক্রেডিটের সঙ্গে বিষয়টা জুড়ে দিয়েছেন।

গল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র হল দীপক শেহগাল। একজন দক্ষ আইনজীবীর চরিত্রকে বিশেষ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন অমিতাভ বচ্চন। তাঁকে নিয়ে বিশেষ কিছু না বলাই ভালো। কারম, তিনি যে এই চরিত্রের জন্য পারফেক্ট, তা সুজিত শিরকার অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিলেন। তবে এই সিনেমার মূল ঘটনা দেশের সামাজিক অবস্থাকে একেবারে চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে, মহিলাদের অবস্থা এখনও কোন পর্যায়ে রয়েছে। নিজের জীবন বাঁচাতে গিয়ে সমাজের কাছে কী কী জবাবদিতে হয় প্রত্যেক মহিলাকে, তা আদালত কক্ষে গমগম করেছে।

চিত্রনাট্য: সিনেমার মূল কান্ডারি কিন্তু রীতেশ শাহ। তাঁর চিত্রনাট্য ছবির কাঠামোকে ধরে রাখে। যে কারণে, ‘পিঙ্ক’ এখনও পর্যন্ত বছরের সেরা ছবির তকমা পাচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গল্পের সীমাবদ্ধতা, তারকাদের অভিনয়ের ঘাটতিও সামলে নিয়েছে অসাধারণ নিপুণতার সাথে লেখা সিনেমার চিত্রনাট্য।

পরিচালনাঃ কলকাতা বাংলা সিনেমার আলোচিত পরিচালক অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী বলিউডে তার অভিষেক ঘটান এই সিনেমা দিয়ে। তবে অনিরুদ্ধের সবক’টা ছবির চেয়ে ‘পিঙ্ক’ আলাদা। ছবির ক্রিয়েটিভ প্রোডিউসার সুজিত সরকার। অনিরুদ্ধ না সুজিত, কে আসলে পরিচালনা করেছেন সেটা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সেসবে আমল না দিয়ে ছবিটাকে একটা টিমের প্রয়াস ভাবা যেতে পারে। বিশেষ করে সিনেমার তারকাদের ভিতর থেকে বাস্তবধর্মী অভিনয় বের করে নিয়ে আসতে পারা তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। খুবই যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী বিষয়বস্তু নিয়ে তৈরি এই ছবিটি অনিরুদ্ধের অনেক যত্নের কাজ সেটা সিনেমার গল্পের বর্ননায় সুস্পষ্ট। তবে কিছু কিছু জায়গায় কিছু অসম্পূর্ণতা বিবেচনায় আসা উচিৎ ছিলো। যেমন, অমিতাভের সাথে সারাহ নামের মহিলার সম্পর্কের সুস্পষ্ট কোন ব্যাখ্যা সিনেমাতে পাওয়া যায়না!

অভিনয়: সিনেমার তারকাদের অভিনয়ের প্রসঙ্গ আসলে বলতে হবে, অমিতাভ পুরো সিনেমার প্রানভোমড়া। তার মতো একজন অভিনেতার কথা আলাদা বলার কিছু নেই। অসাধারণ অভিব্যাক্তি আর সংলাপের ডেলিভারি, অমিতাভের কাছ থেকে আপনার চোখ সরিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। বিশেষ করে আদালতের সওয়াল-জবাবের চাপানউতোর দেখতে ভালই লাগে।

মিনল, ফলকের চরিত্রে তাপসী আর কীর্তি। অ্যান্ড্রেয়া নিজের নাম-ভূমিকায়। ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশের (মেঘালয়) প্রতিনিধিকে মূলস্রোতের ছবিতে ঠাঁই পেতে দেখে ভাল লাগে। এঁরা কেউই একবারের জন্যেও অভিনেত্রী হয়ে ওঠেননি। রোজগার করে নিজের মতো বাঁচতে চাওয়া মেয়েদের প্রতিনিধি এঁরা। অমিতাভ প্রবীণ বয়সে জীবনের সেরা চরিত্রগুলো পাচ্ছেন।

উপসংহারঃ আসলে পিঙ্ক এমন একটি সিনেমা যা আমাদের সমাজে নারীর বিরুদ্ধে দ্বিমুখী আচরণের মুখোশ উম্মোচন করে। সিনেমাতে অভিনয় করা প্রত্যেক তারকার বাস্তবধর্মী অভিনয় আপনাকে তাক লাগিয়ে দিতে বাধ্য। এই সিনেমার বার্তাটা স্পষ্ট। নিজের শরীর, গোলাপি ঠোঁট, যোনির কমনীয়তা যেখানে অধিকার একমাত্র নারীরই। যদিও পুরুষ জাত্যাভিমানের চোটে নিজেদের অধিকারী মনে করে নেয়। দাবি চাপাতে থাকে। বোঝে না, মেয়েটি স্বেচ্ছায় রাজি না হলে ছেলেটির কোনও দাবিই ধোপে টিকবে না।  সমসময়ের নিরিখে ‘পিঙ্ক’ ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রশ্ন একটাই। যাঁরা ছবিটা দেখবেন, সকলেই কি মানসিকতা বদলাতে পারবেন?

Comments

comments

Leave a Reply

Scroll To Top
0