মেরিলিন মনরোঃ ধূসর সময়ের চির-রঙ্গিন সুন্দরী!

মেরিলিন মনরো। নিঃসন্দেহে হলিউডের সবচেয়ে জনপ্রিয় সেক্স সিম্বল। এখনো তার নাম শুনলেই তরুণ-বুড়ো সব বয়সী সিনেমাপ্রেমীদের হৃদয়ে কেমন একটা আলোড়ন বয়ে যায়। এখনো আবেদনময়তার চূড়ান্ত মাপকাঠি মনরো।

১৯২৬ সালের ১ জুন জন্ম নেয়া এই অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন ৩০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে। হঠাৎ করেই মারা যান মাত্র ৩৬ বছর বয়সে। মৃত্যুর আগের কিছুদিন নানা চড়াই-উৎরাইয়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন ব্যক্তিজীবনে। জমে উঠেছিল কেনেডি-কাণ্ড। সে সময়টি তার ক্যারিয়ারেরও অত্যন্ত ঘটনাবহুল সময়। তখন যে সিনেমাটিতে কাজ করছিলেন, তাতেও চমক ছিল। সেই সিনেমার শুটিং নিয়েও কম নাটক হয়নি। শেষ পর্যন্ত মুক্তিও পায়নি এই সেনসেশন-নায়িকার শেষ সিনেমা।

সিনেমার শুরু

গত শতকের তিরিশ-চল্লিশের দশকে হলিউডে দাপট দেখিয়েছিল স্ক্রুবল কমেডি জনরার সিনেমা। এই জনরার সিনেমাগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, সিনেমাগুলোতে এমন একজন নারীচরিত্র থাকত, কেন্দ্রীয় পুরুষচরিত্রের উপরও যে প্রাধান্য বিস্তার করত। আর এই প্রাধান্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওই দুই চরিত্র কৌতুককর এক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হত। এই জনরার অন্যতম ক্ল্যাসিক উদাহরণ মাই ফেভারিট ওয়াইফ (১৯৪০)। বিখ্যাত কবি আলফ্রেড লর্ড টেনিসন যখন গ্রেট ব্রিটেনের রাজকবি ছিলেন, তখন তিনি ইনোচ আর্ডেন নামে একটি কবিতা লেখেন (১৮৬৪)। সিনেমাটির মূল ভাবনা নেয়া হয়েছিল এই কবিতা থেকেই।

ষাটের দশকের শুরুতেই টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরি ফক্স সিদ্ধান্ত নেয়, তারা এই সিনেমাটি রিমেক করবে। নতুন সিনেমাটির নাম ঠিক করা হয় সামথিংস গট টু গিভ। পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় জর্জ কিউকর-কে। প্রযোজনা করেন হেনরি ওয়েইনস্টাইন। স্যামুয়েল এবং বেলা স্পেওয়াকের চিত্রনাট্য নতুন করে সাজানোর কাজে লাগেন ওয়াল্টার বার্নস্টাইন আর নুনালি জনসন।

অভিনয় করবেন মেরিলিন মনরো

তখন মেরিলিন মনরো প্রায় বছরখানেক ধরে পর্দার আড়ালে। তার শেষ সিনেমা দ্য মিসফিটস-এর (১৯৬১) কাহিনি ও চিত্রনাট্য লিখেছিলেন তার স্বামী আর্থার মিলার। সে বছরই মিলারের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তখন তার শরীরও খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না। দুটো বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করতে হয়েছিল। ওজনও কমে গিয়েছিল প্রায় ২৫ কেজি। তবে ১৯৬২ সালেই তিনি আবার আলোচনায় ফিরে আসেন। সে বছরের গোল্ডেন গ্লোবের আসরে অ্যাওয়ার্ড জিতে। আর তারপরই তিনি সিনেমাটিতে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন।

সিনেমাটিতে মেরিলিন মনরো এলেন আর্ডেন চরিত্রে অভিনয় করেন। মনরোর চরিত্রের বিপরীত চরিত্র ছিল দুটি। সে দুটি চরিত্রে কারা অভিনয় করবেন, সেটিও তিনি পছন্দ করে দেন। ডিন মার্টিন এবং ওয়ালি কক্স। অন্যান্য চরিত্রগুলোর জন্য পছন্দ করা হয় সিড চেরিস, ফিল সিলভার্স, টম টায়রন এবং স্টিভ অ্যালেনকে।

শুটিংয়ের শুরু এবং কেনেডি-কাণ্ড

ইতিমধ্যেই মনরোর সঙ্গে তার তৃতীয় স্বামী আর্থার মিলারের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। মনরোর ঘনিষ্ঠতা হচ্ছিল তৎকালিন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির সঙ্গেও। এমনকি সিনেমার কাজ শুরু করার আগেই, মনরো ১৯ মে ছুটি নিয়ে রাখেন। সেদিন যে জন এফ কেনেডির জন্মদিন। হোয়াইট হাউস থেকে অনুরোধ করা হয়েছে, তাকে সেদিন নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে হবে। মঞ্চে উঠে কিছু করে মিস্টার প্রেসিডেন্টকে শুভেচ্ছা জানাতে হবে।

২৩ এপ্রিল সিনেমাটির শুটিং শুরু হল। কিন্তু প্রথম দিনই শুটিংয়ে এলেন না মনরো। প্রয়োজক ওয়েইনস্টাইনকে ফোন করে জানালেন, তার সাইনাসে ইনফেকশন হয়েছে। ইউনিটের ডাক্তারকে পাঠানো হল তার বাসায়। ডাক্তার জানালেন, শুটিং পিছিয়ে দিতে হবে এক মাস। পরিচালক জর্জ কিউকর অবশ্য শুরুতেই শুটিং পেছাতে রাজি হলেন না। তিনি বরং শুটিং শিডিউল খানিকটা বদলে নিলেন। যে সব সিকোয়েন্সে মনরো নেই, সেগুলো শুট করতে লাগলেন। এভাবে শুটিং চলল দুই মাস। বেশিরভাগ দিনই মনরো অনুপস্থিত থাকলেন। কারণ বা অজুহাত- অসুস্থতা। কোনোদিন জ্বর, কোনোদিন মাথাব্যথা, কোনোদিন সাইনোসাইটিস আবার কোনোদিন ব্রঙ্কাইটিসের প্রকোপে শুটিংয়ে যাওয়া হয় না মনরোর। শুধু মনরোর জন্যই শুটিং শিডিউল পেছাতে লাগল।

এর মধ্যে জন এফ কেনেডির জন্মদিন চলে আসল। ১৯ মে-র আগে-পরে মনরো যে পরিমাণ অসুস্থ ছিলেন, ইউনিটের সবাই ভেবেছিল, মনরো সেদিন ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে যেতেই পারবেন না। কিন্তু মনরো সেখানে ঠিকই উপস্থিত হলেন। আর সেই লাইভ প্রোগ্রামে পুরো আমেরিকাকে স্বাক্ষী রেখে, তার অসম্ভব আবেদনময়ী কণ্ঠে, প্রায় বিবস্ত্র হয়ে মিস্টার প্রেসিডেন্টকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন।

হলিউডের প্রথম নগ্ন দৃশ্য

নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরে এসে, সিনেমাটির জন্য মনরো ভীষণ এক পাবলিসিটি স্টান্ট করে বসলেন। হলিউডের মূল ধারার সিনেমায় প্রথমবারের মতো কোনো নায়িকা সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হলেন।

সিকোয়েন্সটি ছিল এরকম— এলেন (মনরো) পুলে সাঁতার কাটতে কাটতে নিককে (ডিন মার্টিন) ডাকে, পুলে নামার জন্য। নিক উল্টো এলেনকে পুল থেকে উঠে আসতে বলে। তখন নিক খেয়াল করে, এলেন বিবস্ত্র অবস্থায় সাঁতার কাটছে।

দৃশ্যটিতে অভিনয় করতে মনরোর জন্য একটা বডি স্টকিংও বানানো হয়েছিল, গায়ের রঙের। কিন্তু মনরো সেই স্টকিং ছাড়াই, কেবল অন্তর্বাসের নিচের অংশ পরেই দৃশ্যটাতে অভিনয় করেন। দৃশ্যধারণ শেষে চিত্রসাংবাদিকদেরও ডেকে নেয়া হয়। চিত্রসাংবাদিকরা সেভাবে তো বটেই, পরে ওই অন্তর্বাসটুকু ছাড়াও তার ছবি তোলার সুযোগ পান।

শেষবারের মতো সিনেমার সেটে

১ জুন ১৯৬২। মেরিলিন মনরোর ৩৬তম জন্মদিন। সিনেমার সেটে মনরোর জন্মদিন উদযাপনের সব আয়োজন প্রস্তুত ছিল সকাল থেকেই। কিন্তু জর্জ কিউকর দিনের শুটিং শেষ না করে উদযাপন করতে দিলেন না। মনরো আবার কবে শুটিংয়ে আসে, তা কে জানে!

সেদিন মনরোর জন্মদিন উপলক্ষে সাত পাউন্ডের একটা কেক আনা হয়েছিল। ইউনিটের ইলাস্ট্রেটর একটা কার্টুনও এঁকেছিল। গায়ে শুধু তোয়ালে জড়ানো মনরোর সেই বিখ্যাত ছবিটা দিয়ে।

জুনের ৪ তারিখেই আবারও সেটে অনুপস্থিত মনরো। ওয়েনস্টাইনকে ফোন দিয়ে বললেন, সাইনোসাইটিস। ততদিনে পরিচালক যারপরনাই বিরক্ত। এবার একটা হেস্ত-নেস্ত করেই ফেলতে চান। হলোও তাই। ৮ তারিখ স্টুডিওর পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হল, সিনেমা থেকে বাদ পড়েছেন মেরিলিন মনরো। কারণ, অপেশাদার আচরণ ও অধিক মাদক গ্রহণ। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরি ফক্স কেবল তাকে বাদ দিয়েই ক্ষান্ত হল না, তার নামে চুক্তিভঙ্গের মামলাও ঠুকে দিল। সাড়ে সাত লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে।

১৯৯০ সালের দিকে এসে অবশ্য ওয়েনস্টাইন অন্য তথ্য জানান। সিনেমাটির শুটিংয়ের সময় মনরোর মাদক গ্রহণ বিষয়ক কোনো জটিলতাই নাকি হয়নি। আসলে অনিয়ম বা মাদক নয়, তাকে বাদ দেয়ার কারণ ছিল অর্থমন্দা। তখন নাকি টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরি ফক্সের ব্যবসায়ে বেশ মন্দা চলছিল। একে তাদের টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলো জমছিল না। তার উপর বিগ-বাজেট ক্লিওপেট্রা (এলিজাবেথ টেইলর অভিনীত) বানাতে গিয়ে বাজেটের চেয়েও খরচ হচ্ছিল বেশি। আর সেই খড়্গ নেমে আসে মনরোর উপর।

ফের চুক্তিবদ্ধ

তাতে অবশ্য মনরোর খুব একটা কাজ কমেনি। অবসরে মনরো লাইফকসমোপলিটনভোগ— তিন গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেন। ভোগে সেবারই তিনি প্রথম ফটোশুট করেন। পরে টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরি ফক্স নাকি সিনেমাটি শেষ করার জন্য আবার তাকেই প্রস্তাব দেয়।

প্রথমে তারা মনরোকে বাদ দিয়ে লি রিমিককে চরিত্রটির জন্য বাছাই করে। কিন্তু ডিন মার্টিন সোজা বলে দেন, নো মেরিলিন, নো মার্টিন। সব দেখেশুনে প্রতিষ্ঠানটি মনরোকেই আবার প্রস্তাব দেয়। মনরো-জটিলতা এড়াতে বদলে ফেলা হয় পরিচালক। আর মনরোর জন্য প্রস্তাব আগের একটি সিনেমায় ১ লাখ ডলারের বদলে এবারে দুইটি সিনেমায় ৫ লাখ ডলার। সামথিংস গট টু গিভ-এর সঙ্গে মনরোকে অভিনয় করতে হবে হোয়াট আ ওয়ে টু গো! নামের আরেকটি সিনেমায়।

শেষ হলো না শেষ সিনেমা

৩ আগস্ট লাইফ পত্রিকাকে সাক্ষাৎকার দেন মনরো। আর ৫ আগস্ট রাতে রহস্যজনকভাবে মারা যান তিনি। ময়নাতদন্তে কারণ বেরিয়ে আসে, ঘুমের ওষুধের ওভারডোজ।

তবে তার মৃত্যু নিয়ে রহস্য রয়ে গেছে আজও। আজও অনেকেই সন্দেহ করেন, ঘুমের ওষুধের ওভারডোজ নয়, বরং কোনো বিশেষ কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। অনেকেরই সন্দেহের আঙুলটা কেনেডির সঙ্গে তার সম্পর্কের দিকে।

মনরোর মৃত্যুতে শেষ হয়ে যায় থমকে-থাকা তার অভিনীত শেষ-সিনেমাটির কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও। মনরোর মৃত্যুর পর টুয়েন্টিন্থ সেঞ্চুরি ফক্স সিনেমাটির কাজই বন্ধ করে দেয়। পরে, কাহিনিতে আরও ঘষামাজা করে, ১৯৬৩ সালে সিনেমাটি নতুন করে বানানো হয় মোভ ওভার, ডার্লিং নামে।

১৯৬৩ সালেরই এপ্রিলে একই প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে মুক্তি পায় মনরোকে নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি মেরিলিন। তাতে মনরো অভিনীত ফুটেজগুলোর কিছু অংশ ব্যবহৃত হয়। আর প্রায় সম্পূর্ণ ফুটেজই ব্যবহৃত হয় ১৯৯০ সালের ডকুমেন্টারি মেরিলিন: সামথিংস গট টু গিভ-এ। পরে ১৯৯৯ সালে প্রমিথিউস এন্টারটেইনমেন্টের বানানো মেরিলিন মনরো: দ্য ফাইনাল ডেইস-এও ফুটেজগুলোর অংশবিশেষ ব্যবহৃত হয়।

Comments

comments

Scroll To Top