‘যাব হ্যারি মেট সেজাল’ – একটি সম্ভাবনার পর্যালোচনা ও কিছু কথা!

আমরা সবাই জানি যে, রোম্যান্টিক সিনেমায় শাহরুখ খান সবসময়ই অনবদ্য। এই জেনারের সিনেমাতে কিং খানের সফলতার হার প্রায় শতভাগ। ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশে শাহরুখ খানের নিজস্ব একটা ভাষা থাকে আর সে ভাষাই তাকে রোম্যান্টিক চরিত্রে অন্যদের থেকে আলাদা করে। এমনিতেই তিন খানের সিনেমা মুক্তির প্রাক্কলে সিনেমা নিয়ে উত্তেজনা থাকে আকাশচুম্বী। আর যদি কিং অব রোমান্স নিয়ে আসেন কোন রোম্যান্টিক সিনেমা তাহলেতো কথাই নেই!!!

আগামী সপ্তাহেই মুক্তি পাচ্ছে শাহরুখ খান অভিনীত নতুন সিনেমা ‘যাব হ্যারি মেট সেজাল’। এই ছবিতে শাহরুখ খানের বিপরীতে অভিনয় করেছেন আনুশকা শর্মা। ইমতিয়াজ আলী পরিচালিত সিনেমাটি যে একটি হালকা মেজাজের প্রেমের সিনেমা সেটা কারো আর বুঝতে বাকি নেই। এখন আলোচনা দর্শকদের কাছে সিনেমাটির গ্রহণযোগ্যতা এবং বক্স অফিসের ফলাফল নিয়ে। সিনেমাটির বিভিন্ন প্রেক্ষিত বিবেচনায় সিনেমাটির ব্যাবসায়িক সম্ভাবনার পর্যালোচনা তুলে ধরতেই এই লেখা।

নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে নতুন শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত একটা লম্বা সময় ধরে বলিউডে শাহরুখ খান রাজত্ব করেছেন। এই সময়ে বক্স অফিসে সফলতার সাথে এই নামটি ছিলো সমার্থক। তার একচ্ছত্র আধিপত্যের কারনেই তাকে ডাকা হয় ‘কিং খান’, ‘কিং অব বক্স অফিস’ ইত্যাদি নামে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শাহরুখ খানের কোন সিনেমাই তার নাম আর উপাধির প্রতি সুবিচার করতে পারেনি। নিজের পছন্দের ‘রোম্যান্টিক’ সিনেমা দিয়ে কি স্বরূপে ফিরতে পারবেন শাহরুখ খান না আরো অপেক্ষা করতে হবে তাকে? কেমন হবে আনুশকার সাথে তার নতুন রসায়ন? এবার কি দর্শকদের প্রত্যাশার যতাযথ মূল্যায়ন করতে পারবেন কিং খান? চলুন একটু দেখে নেয়া যাক এইসব সম্ভাবনার পর্যালোচনা।

দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং বক্স অফিসে সফলতার ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে শাহরুখ খানের এই সিনেমাকে। এখন পর্যন্ত সিনেমার ভালো দিক বলতে সর্বশেষ প্রকাশিত রোম্যান্টিক গান ‘হাওয়ায়ে’! এছাড়া শাহরুখ খানের সিনেমার কিছু ট্রেডমার্ক উপাদান সিনেমাতে পুরপুরি অনুপস্থিত। সেই বিষয়গুলোকেই ফোকাস করতে চাই।

১। রোম্যান্টিক চরিত্রে শাহরুখ – কিন্তু………

প্রথমেই বলেছি রোম্যান্টিক সিনেমায় শাহরুখ খান অনবদ্য। কিন্তু যখনই আপনি একটি প্রেমের গল্প বলতে যাবেন তখন সেই গল্পের প্রেক্ষাপটে গল্পের মূখ্য চরিত্রের গ্রহনযোগ্যতার একটা প্রশ্ন চলেই আসে। ২৫ বছর আগে রাজ আর রাহুলের মত চরিত্র রুপায়ন করে আসা ৫১ বছর বয়সী শাহরুখ খানকে এরকম চরিত্রে মেনে নিতে দর্শক কতটুকু প্রস্তুত? এই সিনেমার ক্ষেত্রে শাহরুখ খানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দর্শককে এই জায়গাতে অভ্যস্ত করা।

২। পরিচালক ইমতিয়াজ আলীর গল্প বলার ধরন

বলিউডের বর্তমান সময়ের অন্যতম আলোচিত পরিচালক ইমতিয়াজ আলী। তার পরিচালিত সিনেমাগুলো সমালোচকদের কাছে প্রশংসা পেলেও দর্শকদের কাছে আহামরি কোন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ইমতিয়াজ আলী পরিচালিত ‘যাব উই মেট’ এবং ‘রকস্টার’ হিট তকমা পেলেও সিনেমা দুইটির মুল বাজার ছিলো মেট্র এলাকা গুলো (বিশেষ করে মাল্টিপ্লেক্স গুলোতে)। ছোট সেন্টার বা Mass Audience Dominated এলাকাগুলোতে ইমতিয়াজ আলীর সিনেমা দর্শক টানতে ব্যার্থ। কারণটাও স্বাভাবিক, ইমতিয়াজ আলীর গল্প বলাত ধরনটা মেট্র বা মাল্টিপ্লেক্স দর্শকদের জন্য মাননসই। ছোট সেন্টারের দর্শকরা যে ধরনের সিনেমা পছন্দ করে ইমতিয়াজ আলীর নির্মান তার বিপরীত। এই কারনেই, ইমতিয়াজ আলীর সিনেমা সিঙ্গল স্ক্রিনের দর্শকদের সাথে কোন সংযোগ তৈরি করতে পারেনা। আর যেকোন সিনেমার বড় মাপের বক্স অফিস আয়ের জন্য সিঙ্গল স্ক্রিন অনেক বড় একটি ইস্যু।

৩। মিনি ট্রেলার এবং ট্রেলারে আকর্ষনীয় উপাদানের অনুপস্থিতি

সিনেমার প্রচারে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রেড চিলিস ‘ডিয়ার জিন্দেগী’ এর কৌশল অবলম্বন করেছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ‘ডিয়ার জিন্দেগী’ ছবির ধরনের সাথে কৌশল সময়পযোগী ছিলো। একই কৌশল ‘যাব হ্যারি মেট সেজাল’ এর ক্ষেত্রে অনেটাই হিতে বিপরীত। চারটি মিনি ট্রেলারে সিনেমার গল্প অনেকটাই পরিষ্কার। আর আগের চারটি মিনি ট্রেলারের সংযোজনেই ছিলো মূল ট্রেলার। তাই ট্রেলারে দর্শক আসলে নতুন কিছুই পায়নি। এমনকি শাহরুখ খানের ‘রাইস’ এর ট্রেলার যে পরিমাণ আলোচনা তৈরি করেছিলো এই ছবির ট্রেলার তার সিকিভাগও করতে পারেনি। ভ্রমণ, ফান, রোমান্স এবং বাগদত্তাকে ছেড়ে অন্যের সাথে চলে যাওয়া এর বেশী কোন টুইস্ট ট্রেলারে ছিলোনা যেটা দর্শকে সিনেমাহলে টেনে আনবে!

৪। বড় ধরনের চার্ট ব্লাস্টার গানের অনুপস্থিতি

বলিউডের সিনেমায় গান সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সিনেমার প্রচারে গানের ভূমিকা অপরিসীম। শাহরুখ খানের এই সিনেমার গানগুলো লিখেছেন আরশদ কামিল এবং সুর করেছেন প্রীতম। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকাশিত গানগুলোর মধ্যে ‘হাওয়ায়ে’ এবং ‘সফর’ ছাড়া বাকি সবগুলো গানই মোটামোটি। আর সিনেমার প্রচারে ভূমিকা রাখার মত গান আসলে অনুপস্থিতই বলা চলে।

৫। মুক্তি সময় এবং দ্বিতীয় সপ্তাহেই অক্ষয়ের ছবির সাথে প্রতিযোগিতা

শাহরুখ খানের সিনেমা সবসময়ই বড় বাজেটের হয়ে থাকে। এইরকম বড় বাজেটের সিনেমার বক্স অফিসে ভালো ফলাফল পেতে মুক্তির সময় খুবই জরুরী। শাহরুখ খানের সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে ৪ঠা আগস্ট। এই সপ্তাহে কোন সরকারী ছুটি নেই (শুধু সোমবার রক্ষা বন্ধনের কারনে ভারতের কিছু অংশে বদ্ধ), যা এই সিনেমার ব্যাবসায়িক সম্ভাবনা কিছুটা কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে ১১ই আগস্ট মুক্তি পাবে অক্ষয় কুমারের আলোচিত সিনেমা ‘টয়লেট – এক প্রেম কাথা’। এরমানে মুক্তির দ্বিতীয় সপ্তাহেই বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে কিং খানকে। এই প্রতিযোগিতা দ্বিতীয় সপ্তাহে সিনেমার ব্যবসায়িক সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই কমিয়ে দিবে।

৬। প্রাক-মুক্তি উম্মাদনা

শাহরুখ খানের অন্য সিনেমাগুলোর ক্ষেত্রে মুক্তির আগে যে উম্মাদনা দেখা যেত এই সিনেমার ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত। শাহরুখ খানের সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো মুক্তির আগে যে পরিমাণ আলোচনার জন্ম দিয়েছিলো ‘যাব হ্যারি মেট সেজাল’ সেটা করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। এই প্রাক-মুক্তি উম্মাদনা সাধারণত বক্স অফিসে যেকোন সিনেমার প্রাথমিক একটা ভিত গড়ে দেয়, যা এই সিনেমার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছেনা।

তবে সব কথা শেষ কথা সিনেমার মুল জিনিস হলো তার কনটেন্ট। শেষ পর্যন্ত যদি সিনেমার কনটেন্ট ভালো হয় এবং সেটা দর্শকদের আগ্রহ তৈরি করতে পারে তাহলে এইসব হিসাবনিকাশ দিনশেষ অমূলক। চলমান ট্রেন্ড এবং বর্তমানে বলিউডে চলে আসা ধারার আলোকপাতে এই লেখা। আপাতত অনেকদিন পর প্রিয় তারকাকে আবারও একদম পরিচ্ছন্ন প্রেমের গল্পে দেখা যাবে এটাই কম কিসের? হয়তো এই সিনেমা দিয়েই তিনি বদলে দিতে পারেন ভালোবাসার সংজ্ঞা। হয়ত এরপর থেকে ‘হ্যারি’ হয়ে উঠবে আদর্শ প্রেমিকের উপমা। অপেক্ষা আর মাত্র কয়েকদি

Comments

comments

Scroll To Top
0