যৌথ প্রযোজনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘটনা প্রবাহ ও একটি পর্যালোচনা

যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণের পক্ষে বিপক্ষে সরগরম চলচ্চিত্র পাড়া। গত কিছুদিন ধরেই বড় ধরনের টানপোরনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে গোটা ঢালিউড। আসন্ন ঈদে মুক্তি প্রতীক্ষিত যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘বস ২’ এবং ‘নবাব’ সিনেমার মুক্তি নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে জাজ মাল্টমিডিয়া এবং চলচ্চিত্র ঐক্যজোট। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং সংবাদ সম্মেলন দিয়ে নিজেদের দাবি এবং অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছে দুই পক্ষ।

এই চলমান অচলাবস্থার মধ্যে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর হস্তক্ষেপও দৃশ্যমান কোন সমাধানের পথ দেখাতে পারেনি। এদিকে প্রদর্শক সমিতি এবং বুকিং এজেন্ট সমিতির পক্ষ থেকে সিনেমাহল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি থেকে শুরু করে আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের হাতে মধুমিতা সিনেমা হল মালিকের লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটেছে। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের এই দুঃসময়ে চলচ্চিত্র পরিবারের এই পরষ্পরমুখী অবস্থানে হতাশ আমার মত সিনেমাপ্রেমীরা। চলমান এই আন্দোলন এবং অচলাবস্থা শেষ পর্যন্ত কোনদিকে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের এই সিনেমার শিল্পকে? শেষ পর্যন্ত কি ঘটবে আসন্ন ঈদের সিনেমাগুলোর ভাগ্যে? সিনেমা শিল্পের উন্নয়নে সম্পূরক এই সমিতিগুলোর পরস্পর বিরোধী অবস্থান সামগ্রিকভাবে আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য কতটা ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়াবে?

চলুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক যৌথ প্রযোজনার এই বিতর্কে এখন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সব ঘটনা প্রবাহ।

১। প্রিভিউ কমিটিতে ‘বস ২’ এবং ‘নবাব’ সিনেমার বিরুদ্ধে চলচ্চিত্র ঐক্যজোটের অভিযোগ

ঘটনার শুরু ‘বস ২’ এবং ‘নবাব’ সিনেমার বিরুদ্ধে চলচ্চিত্র ঐক্যজোটের নিয়ম ভাঙ্গার অভিযোগ দিয়ে প্রভিউ কমিটিকে চিঠি দেয়া থেকে। ছবি দুইটিকে মুক্তির অনুমতি দেয়ার আগে তদন্তের অনুরোধ জানিয়ে সেন্সর প্রিভিউ কমিটিকে লিখিত চিঠি পাঠায় চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সংগঠন নিয়ে গঠিত চলচ্চিত্র ঐক্যজোট। চিঠিতে ছবি দুটি যৌথ প্রযোজনার সঠিক নিয়ম মেনে নির্মাণ হয়েছে কিনা, সেটা সঠিকভাবে খতিয়ে দেখতে বলা হয়।

২। ‘বস ২’ সিনেমার বিরুদ্ধে যৌথ প্রযোজনার প্রিভিউ কমিটির নিয়ম ভঙ্গের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে চিঠি

চলচ্চিত্র ঐক্যজোটের চিঠির প্রেক্ষিতে প্রিভিউ কমিটি যৌথ প্রযোজনার ‘বস ২’ সিনেমার বিরুদ্ধে নিয়মভঙ্গের অভিযোগ করা হয়। ‘বস-টু’ সিনেমাটির প্রদর্শন শেষে সিনেমাতিতে শিল্পী নেয়ার ক্ষেত্রে বেশ অসামঞ্জস্যতা রয়েছে বলে মত প্রকাশ করে সেন্সর প্রিভিউ কমিটি। সিনেমাটিতে শিল্পীদের অসামঞ্জস্যতা এ বিষয়টি লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পাঠানো হয় এবং এই অনিয়ম বিবেচনাপূর্বক পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়। পরবর্তিতে যৌথ প্রযোজনার অন্য সিনেমা ‘নবাব’ এর বিরুদ্ধেও নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ করা হয়।

৩। যৌথ প্রযোজনার সিনেমা রোধে ঐক্যজোটের আন্দোলন এবং তথ্য মন্ত্রীর আশ্বাস

নিয়ম ভেঙ্গে নির্মিত যৌথ প্রযোজনার ‘বস ২’ এবং ‘নবাব’ সিনেমার মুক্তি প্রতিহত করতে বিএফডিসির সামনে অবস্থান ধর্মঘটসহ কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেন ঐক্যজোটের নেতাকর্মীবৃন্দ। একইদিনে ঐক্যজোটের আন্দোলনরত চলচ্চিত্রকর্মীরা সেন্সর বোর্ড ঘেরাও করেন এবং সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান নেন। পরবর্তিতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু অন্দোলনরত নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলেন। তিনি যৌথ প্রযোজনার সিনেমারগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মভঙ্গের লিখিত তালিকা চান এবং অনিয়ম রোধের আশ্বাস দেন।

৪। ‘বস ২’ এবং ‘নবাব’ প্রসঙ্গে শাকিব খান, ফারিয়া সহ তথ্য মন্ত্রীর সাথে জাজ প্রতিনিধিদের বৈঠক

এদিকে ঐক্যজোটের আন্দোলনে অচলাবস্থার মধ্যে সিনেমা দুটি প্রসঙ্গে শাকিব খান, ফারিয়া সহ তথ্য মন্ত্রীর সাথে বৈঠক করে জাজের প্রতিনিধিদল। ‘বস টু’ আর ‘নবাব’ মুক্তির ব্যাপারে আপত্তিরবিপরীতে ছবি দুটি মুক্তির ব্যাপারে আলোচনা করে এই প্রতিনিধি দল।

৫। প্রদর্শক সমিতি এবং বুকিং এজেন্ট সমিতির যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলন

তথ্যমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের দিন সন্ধ্যার পর একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে হল মালিকদের সংগঠক চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি ও চলচ্চিত্র বুকিং এজেন্ট সমিতি এবং জাজ মাল্টিমিডিয়া। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শাকিব খান এবং আরিফিন শুভ সহ আরো অনেকে। এতে যৌথ প্রযোজনার নিয়ম না মানার অভিযোগে আটকে থাকা দুটি ছবি মুক্তি না পেলে হল বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়া দেন সমিতির নেতারা।

৬। ‘বস ২’ এবং ‘নবাব’ প্রদর্শনীর পর প্রিভিউ কমিটির অনাপত্তিপত্র প্রদান

প্রাথমিকভাবে ‘বস ২’ সিনেমার ব্যাপারে প্রিভিউ কমিটি আপত্তি জানালেও পরবর্তিতে জাজ মাল্টিমিডিয়ার পক্ষ থেকে লিখিত মুসলেখার প্রেক্ষিতে সিনেমাতিকে অনাপত্তিপত্র প্রদান করে কমিটি। পরবর্তিতে ‘নবাব’ সিনেমার ব্যাপারেও একই সিদ্ধান্ত জানায় প্রিভিউ কমিটি। ‘বস ২’ এর মত এই সিনেমাটিকেও অনাপত্তিপত্র প্রদান করে কমিটি।

৭। সেন্সর বোর্ডে প্রদর্শনী প্রতিরোধ করতে ঐক্যজোটের নেতাকর্মীদের সেন্সর বোর্ড ঘেরাও

‘বস ২’ এবং ‘নবাব’ সিনেমা দুটিকে প্রিভিউ কমিটি অনাপত্তিপত্র প্রদান করায় সিনেমা দুটি সেন্সর বোর্ডে প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত হয়। এতে করে ঐক্যজোটের নেতাকর্মীরা নতুন করে সেন্সর বোর্ড ঘেরাও করার ঘোষণা দেয়। উক্ত কর্মসুচীতে যেকোন মূল্যে সিনেমা দুটি মুক্তি প্রতিরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই দুটি সিনেমা চালানো হলে সিনেমা হলে আগুন লাগিয়ে দেওয়ারও ঘোষণা দেন আন্দোলনরত নেতাকর্মীরা। শুধু তাই নয় এই কর্মসূচী চলাকালে ঐক্যজোটের নেতাকর্মীদের হাতে মধুমিতা হলের মালিক এবং সেন্সর বোর্ডের সদস্য ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

৮। ‘বস ২’ এবং ‘নবাব’ মুক্তির দাবিতে জাজের মানব বন্ধন

এদিকে ঐক্যজোটের সেন্সর বোর্ডের ঘেরাও কর্মসূচীর বিপরীতে ‘বস ২’ এবং ‘নবাব’ মুক্তির দাবিতে মানব বন্ধন করে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া। “দর্শকের পছন্দ, স্বাধীনতা ও চাহিদা পূরণে বাঁধা দেয়া চলবে না। সিনেমা হল বাঁচলে, চলচ্চিত্র বাঁচবে।” – এই শ্লোগানকে সামনে রেখে এই মানব বন্ধনের আয়োজন করা হয়। চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিচালক-শিল্পী-পরিবেশক-প্রদর্শক-বুকিং এজেন্ট জোটের ব্যানারে এই মানব বন্ধনে সিনেমা হল বাঁচাতে ‘নবাব’ এবং ‘বস ২’ মুক্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

৯। আন্দোলনের মাঝেই ‘বস ২’ এবং ‘নবাব’ সিনেমা দুটিকে সেন্সর ছাড়পত্র প্রদান

অনেক জটিলতা, আন্দোলন এবং বাধা পেরিয়ে অবশেষে সেন্সর ছাড়পত্র পায় ঈদে মুক্তি প্রতীক্ষিত বিতর্কিত ‘বস ২’ ও ‘নবাব’ ছবি দুটি। বুধবার ছবি দু’টো যেন সেন্সর না পায় সেজন্য সেন্সর বোর্ডের সামনে চলচ্চিত্র ঐক্যজোটের আন্দোলনরত অবস্থায়ই সেন্সর সনদ পাওয়া ছবি দু’টোর ঈদে মুক্তি নিয়ে আর কোনো বাধা রইলো না।

১০। চলচ্চিত্র ঐক্যজোটের লাগাতার আন্দোলনের ঘোষণা 

অভিযোগ, আন্দোলন এবং বিতর্কের মাঝেও অভিযুক্ত সিনেমা দুটিকে সেন্সর ছাড়পত্র প্রদানের প্রেক্ষিতে লাগাতার আন্দোলনের ঘোষণা দেয় চলচ্চিত্র ঐক্যজোট। লাগাতার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে সেন্সর বোর্ডের সামন থেকে বুধবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে এফডিসি অভিমুখে রওয়ানা দেয় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

এই মুহুর্তে বাংলা সিনেমা দর্শক এবং সিনেমাপ্রেমীদের মনে ঘুরছে নানামুখী প্রশ্ন। হিসেব নিকাশের জটিলতা দিনদিন  আরো গভীর হয়ে সামনে আসছে। সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় চলমান এই ঘটনায় রাষ্ট্র বা সরকার পক্ষের অবাক করা নীরবতা। এখন পর্যন্ত এই সমস্যা সমাধানে সরকার পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আরো পুরো ঘটনা প্রবাহে সামগ্রিকভাবে আমাদের সিনেমার ক্ষতিটাই সবচেয়ে বেশী।

অসংখ্য কালজয়ী সিনেমা এবং গল্পের জন্ম দেয়া আমাদের এই চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাস অন্য যেকোন শিল্পের চেয়ে সমৃদ্ধ। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতক্ষ্য এবং পরোক্ষ্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া এই শিল্পকে এভাবে নষ্ট করার পাঁয়তারা কোনভাবেই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। পারস্পরিক ব্যবধান এবং দূরত্ব নিরসন করে চলচ্চিত্র শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করাটাই কাম্য। একজন সাধারণ সিনেমাপ্রেমী হিসেবে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের কাছে এটাই প্রত্যাশা।

Comments

comments

Scroll To Top
0