সোনালী সময়ের সিনেমাঃ দেওয়ান নজরুলের ‘মাস্তান রাজা’

দেওয়ান নজরুল অামাদের অ্যাকশন সিনেমার জগতে একটা প্রতিষ্ঠানের নাম। তাঁর ‘দোস্ত দুশমন, বাংলার নায়ক, কালিয়া, জনি’ এ সিনেমাগুলো তাঁকে তাঁর বৈশিষ্ট্যে চিনতে যথেষ্ট। জসিম ছিল তার পছন্দের অার্টিস্ট। জসিমকে দিয়ে তিনি এক্সপেরিমেন্ট করেছেন এবং অালাদা অালাদা ইমেজে তাঁকে তুলে ধরতে পেরেছেন। ‘দোস্ত দুশমন’-এর খলনায়ক জসিমকে দেখে মুগ্ধতা যতটা পাই ‘বাংলার নায়ক’ বা ‘মাস্তান রাজা’-র নায়ক জসিমকে দেখে একইভাবে মুগ্ধতা কাজ করে। বলতে গেলে প্রথমদিকের খলনায়ক জসিম অার পরের নায়ক জসিম দুজনই দুজনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী।

‘মাস্তান রাজা’ দেওয়ান নজরুলের নায়ক জসিমকে তুলে ধরার সিনেমা। তিনি জসিমকে স্টাইলিশ করে উপস্থাপন করেছেন। বেশকিছু জায়গা অাছে যেগুলো ভালো লাগবে দর্শকের। সিনেমাটিতে শাবানাকে জসিমের নায়িকা নয় বড়বোন হিশাবে উপস্থাপন করেছেন পরিচালক। ‘অবদান’ সিনেমাতেও ছিল জসিমের বড়বোন। একটা ভেরিয়েশন এখানেই রয়ে যায়।

মায়ের মৃত্যুর অাগে দেয়া শিক্ষা ‘সদা সত্য কথা বলা, মানুষকে ঘৃণা না করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা’ এগুলো বড়বোন ও দুই ভাইবোন নিজেদের মধ্যে ধারণ করে যেটা ছিল তাদের শৈশবের দিনে। বড়বোনের অসুখের সময় ছোটভাই টাকা ও ওষুধ নিয়ে ফেরার পথে কসাই গাংগুয়ার কবলে পড়ে। ভয়ঙ্কর মূর্তির সামনে প্রথমদিন টাকা দিয়ে দিলেও পরদিন সে প্রতিবাদ করে। বড়বোন এসে বাঁচায়। অসৎ মামা বড়বোনকে বিক্রি করে দিতে চাইলে তাকে খুন করে জেলে যায় ছোটভাইটি। জেল ফেরত সেই ছোটভাই হয় জসিম। জেল থেকে বের হয়েই গাংগুয়ার মুখোমুখি হতে হয় সেই ছোটবেলার মতো চাঁদার জন্য। তখন তো কোনো লাভই হয় না গাংগুয়ার। শিক্ষা দিয়ে দেয়। বাড়ি ফিরে শাবানাকে বলা কথাটা-‘অাপারে, অামরা বড় হয়ে গেলেও দুনিয়া থেকে অন্যায় এখনো শেষ হয়ে যায়নি, অভাবও শেষ হয়নি।’ সেদিন সবাইকে ভালো খাবার খাওয়ায় জসিম। শাবানা, জসিম, কবিতা তিন ভাইবোনের সংসারে এরপর অাঘাত অাসতে থাকে। অাহমেদ শরীফের সাথে দ্বন্দ্বটা বাঁধে কবিতা ও অমিত হাসানের প্রেম থেকে যে অমিত ছিল অাহমেদ শরীফের ছেলে। অন্যদিকে মাহবুব খানের মেয়ে দিতির সাথে প্রেম হয় জসিমের। জসিমকে ফাঁসিয়ে অাহমেদ শরীফ হাত করতে চায় শাবানাকে কিন্তু ব্যর্থ হয় বারবার। জসিম ঘটনাচক্রে মাহবুব খানের হয়ে কাজ করে রাজা থেকে ‘মাস্তান রাজা’ হয়ে যায়। এরপর অাহমেদ শরীফের পতন ঘটে অনেক ঘটনার পরে। হ্যাপি এন্ডিং দিয়ে শেষ হয়।

অনেকে মজা করার জন্য বলে জসিম চিরদিন বস্তির লোকজনকে বাঁচায়, লটারি পায়, রাজু হয়ে শেষ করে সিনেমা। এগুলো জসিমের স্টেরিওটাইপ হিশাবে ব্যাখ্যা করে তারা কিন্তু এটা ভুল। জসিমের বৈচিত্র্য বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি যে নায়ক প্রথমদিকে দাপুটে খলনায়ক পরে দাপুটে নায়ক। পর্দা শাসন করা ছিল যার অভিনয়ধর্ম। সুপার অ্যাকশন নায়ক মান্না-ও তাই ‘অামার অামি’-তে বলে জসিমই তাঁর অাদর্শ। মান্নার অাদর্শ হওয়া কোন লেভেলের কথা হতে পারে এটুকু বহন করার মতো মাথা অল্পই হবে। তো জসিম কি দেখাল ‘মাস্তান রাজা’-তে যেটা বৈচিত্র্যের কাজ করল এতক্ষণে নিশ্চয়ই ভাবা শুরু হয়েছে। বলছি শুনুন-

  • জসিম জেল থেকে বের হয়ে প্রথম দেখা হয় গাংগুয়ার সাথে যাকে সে জানে ‘কসাইয়া’ নামে। চাঁদা না দিয়ে যেতে দেবে না বললে ফাইট শুরু হয়। ফাইটে জসিমের মুভমেন্টগুলো খেয়াল করতে হবে। দেখবেন জসিমের অসাধারণ এক্সপ্রেশনের সাথে হাতপায়ের কসরত দেখা যাবে। নায়ক রুবেল কুংফু দিয়ে যে কসরত করে নায়ক জসিমের কসরত তার থেকে ভিন্ন। জসিম নিজেই তার ‘জ্যাম্বস ফাইটিং গ্রুপ’ থেকে অ্যাকশন দাঁড় করিয়েছিল তাই তার কাছে কসরত যে ডালভাত এটা জানা কথাই। গাংগুয়াকে প্রথম হিটের পর অাঙুল দিয়ে চ্যালেন্জ করে ডাকার মুভমেন্টটা সুপার ডুপার।
  • জসিমকে ফাঁসানোর জন্য পুলিশ চেষ্টা করে। একটা সাদা কাগজে টিপসই নিয়ে সেটাকে তার বোন শাবানার মৃত্যুর দলিল হিশাবে ব্যবহারের চেষ্টা করলে জসিম কাগজটা কেড়ে নিয়ে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। পুলিশ বলে পেট থেকে হলেও বের করবে। জসিম রিভলবার মুখে নিয়ে গালে থাপড়াতে থাপড়াতে পুলিশকে বলে স্যুট করার জন্য কিন্তু পুলিশ পারে না। ঐ সময়ের অভিনয় দেখলে থ হতে হয়।
  • পুরো সিনেমায় জসিমের ঘাড় পর্যন্ত চুল দেখে স্টাইলিশ লাগে যে চুল তাঁর অ্যাকশনের সাথে খাপ খায়।

জসিমের সাথে শাবানাকেও পরিচালক তুলে ধরেছেন অসাধারণভাবে। জসিম ও শাবানার সম্পর্কের মধ্যে দায়িত্ব, সম্মান এসব ছিল চমৎকার। মাস্তান রাজা হওয়ার পর বোন বলে পরিচয় দিতে মানা করে শাবানা। জসিম ছুরির অাঘাতে হাসপাতালে গেলে রক্ত দেয় শাবানাই।জসিম ফিরে এসে শাবানাকে জানায় রক্ত দিয়ে নিজের ভাইকে সে ঠিকই স্বীকার করেছে। বন্ধনকে দেখানো হয়েছে অনবদ্যভাবে। কবিতা-অমিতের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে অাহমেদ শরীফের বাড়িতে গেলে শাবানাকে ‘বেশ্যা’ বলে অপমান করে। শাবানার অসাধারণ এক্সপ্রেশনের সাথে অসাধারণ সংলাপটা ছিল-‘অামি যদি বেশ্যা হই অাপনি অামার দালাল হবারও যোগ্য নন।’ শাবানা-অাহমেদ শরীফ ফেস-টু-ফেস অভিনয় তখন চোখ জুড়াবে। পরেরবার জসিম জেলে গেলে শাবানাকে অপমান করে অাহমেদ শরীফ শাবানা তখন পা থেকে জুতা খুলে পেটায়। কেড়ে নিয়ে অাহমেদ শরীফও জুতাপেটা করে শাবানাকে। ফিনিশিং এ শাবানা জুতাপেটা করে অাহমেদ শরীফকে।

জসিম-অাহমেদ শরীফ নায়ক-খলনায়ক কেমিস্ট্রি ঢালিউডের অন্যতম সেরা যেমন অাছে রুবেল-ফরীদি। জসিমের সাথে অাহমেদ শরীফের সিকোয়েন্সগুলো দুর্দান্ত ছিল। দুজনের লুকই ছিল দেখার মতো। এছাড়া গাংগুয়া এ সিনেমার অন্যতম প্রধান খলনায়ক যার শুরু জসিমের শৈশব থেকেই। গাংগুয়ার ‘কসাইয়া’ ভূমিকা রীতিমত গায়ে কাঁটা দেয়। তার লুকের ভেরিয়েশন ছিল। প্রথমত বড় চুল, পরে পাকা চুলে পাকা দাড়িতে ভিন্ন ইমেজে হাজির হয়েছে এবং সেগুলো এনজয়অ্যাবল। জসিমকে টর্চার করা সেই পুলিশ যে ছিল অাহমেদ শরীফের কিনে নেয়া তাকে গাংগুয়াই জবাই করে। ঐ সিকোয়েন্সে ভয়ঙ্কর অভিনয় করেছে।

কবিতা ও অমিত হাসানের উপস্থিতি খুব কম ছিল। সিনেমাটি জসিম, শাবানা, অাহমেদ শরীফ, গাংগুয়া তাদের উপস্থিতিতে উজ্জ্বল।

‘মাস্তান রাজা’ খুব সাধারণ চোখে সমাজের চিত্র দেখানো অভিনয়সমৃদ্ধ সিনেমা। এতে অন্যায়কে যেমন দেখানো হয়েছে পাশাপাশি প্রতিবাদ অাছে, পারিবারিক বন্ধন দেখানো হয়েছে। সমাজের চিত্র দেখানোই নির্মাতার লক্ষ্য ছিল। জসিমের স্টাইলিশ অ্যাকশনের মধ্যে এ সিনেমা যদি কারো মিস হয়ে থাকে তবে শিগগির দেখে ফেলা উচিত। জসিম অাপনাকে মুগ্ধ করাবেই।

পোস্টার কৃতজ্ঞতা – রাসেল ঈমাম মিঠু

Comments

comments

Scroll To Top