৭ আপত্তিতে সেন্সর বোর্ডে আটকে গেলো ‘হৃদয়ের রংধনু’

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে রাজীবুল হোসেন নির্মিত অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘হৃদয়ের রংধনু’র সেন্সর ফি মওকুফ করা হয়। এরপর ২৭ নভেম্বর সেন্সর শো হলেও ছাড়পত্র তো দূরে থাক বোর্ড থেকে কোন চিঠি পাননি পরিচালক-প্রযোজক। তবে পরিবর্তন ডটকমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ছবিটির ৭টি বিষয়ে সেন্সর বোর্ডের আপত্তি রয়েছে। এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বোর্ড।

এতে দেখা যায়, সেন্সর শো’র পর সাতটি পয়েন্ট চিহ্নিত করে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য চিঠি পাঠায় বোর্ড। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে,ছবিটি বাংলাদেশের পর্যটনের প্রচারণায় নির্মিত হয়েছে।

আপত্তি জানানো বিষয়গুলো হচ্ছে— পর্যটন এলাকায় হোটেল-মোটেলের পরিবর্তে রাতে অসহায় অবস্থায় চরে পরিত্যক্ত তাবুতে পর্যটকদের অবস্থান-রাত্রিযাপনের দৃশ্য ও বিভিন্ন সংলাপ। পর্যটন এলাকায় লাঠিয়াল বাহিনীর চর দখলের দৃশ্য ও সংলাপ। লাঠিয়াল বাহিনীর চর দখলের সময় মারামারিতে বিদেশি নাগরিকসহ পর্যটক মারাত্মক আহত হওয়ার দৃশ্য ও সংলাপ। পর্যটন এলাকার পাশ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্বাহের দুঃখ-কষ্ট-বেদনার দৃশ্য ও সংলাপ। পর্যটন এলাকায় ঝড়-বাদল ও জলদস্যুদের তাণ্ডব সংক্রান্ত কথোপকথনের দৃশ্য। পর্যটন এলাকায় খাবারে দোকানগুলোতে দোকানদারদের অসৌজন্যমূলক আচরণ, কদর্য সংলাপ, ‘খাবার নাই’ বলে পর্যটকদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং খাবার দোকান বন্ধ করে পর্যটকদের সামনে থেকে দোকানদারদের চলে যাওয়ার দৃশ্য ও সংলাপ। জনৈক বিদেশিনীকে পর্যটন এলাকা থেকে সন্ত্রাসীদের দ্বারা অপহরণ, পর্যটন এলাকার নিকটবর্তী জঙ্গলে বিদেশিনীকে আটকে রাখা, সন্ত্রাসীদের দ্বারা তাকে অশালীন ও কদর্যপূর্ণ ভাষায় বাক্য ছুঁড়ে দেওয়া।

এ বিষয়গুলো পর্যটন শিল্পের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে চিঠিতে বলা হয়। আরো বলা হয়, ছবিতে একই সংলাপ একাধিকবার একই সময়ে বা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ব্যবহার, অর্থহীন সংলাপের ব্যবহার ও নিম্নমানের অভিনয় দর্শকদের বিরক্তির উদ্বেগ করতে পারে।

পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠিত হয়। ওই কমিটি চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি ছবিটি পরিচালক রাজীবুল হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে দেখলেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে সেন্সর বোর্ডকে তাদের কোন মতামত দেয়নি।

এ প্রসঙ্গে সেন্সর বোর্ড সচিব মুন্সী জালাল উদ্দিন পরিবর্তনকে বলেন, ‘ছবিটি বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের পর্যটনকে প্রমোট করার জন্য। স্বাভাবিকভাবে পর্যটনের জন্য ক্ষতিকর বিষয় ছিল যা কিনা আমরা চিহ্নিত করে মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চেয়েছি। তারা আমাদেরকে এখনো কোন উত্তর দেননি।’

তবে পরিচালক জানালেন, আপত্তির বিষয়গুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে পারেননি। বোর্ডের কাগজপত্র দেখালে পরিবর্তনকে বেশকিছু পয়েন্টে ব্যাখ্যা করেন এভাবে— ‘চর দখলের মারামারিতে বিদেশি পর্যটক আহত হয় সত্য, কিন্তু এটা তো তাকে উদ্দেশ্য করে ছিল না। তাছাড়া বিদেশিনী পর্যটক যখন তার বন্ধুদের নিয়ে স্থানীয় জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনে সহয়তা শুরু করে তখন জলদস্যু নেতার ওই বিদেশিনীকে একবেলা খাবার খাওয়ানোর ইচ্ছে জাগে এবং সে লোক পাঠায় তাকে নিয়ে আসার জন্য। জলদস্যুরা তো স্বাভাবিকভাবে একটা মানুষের সাথে কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা জানে না। তাই তারা তাকে তুলে নিয়ে আসে, কিন্তু তা ক্ষতির উদ্দেশ্যে ছিল না। এছাড়া দোকানদার কর্তৃক খাবার নাই বলার ব্যাপারটি হচ্ছে একটি দোকানে গিয়ে কয়েকজন বন্ধু মিলে খাবার ও পানি চাইলে দোকানদার বলে টেবিলে দেওয়া আছে, নিয়ে খান। এটাতো স্বাভাবিকভাবে অনেক জায়গায় ঘটছে।’

পর্যটন করপোরেশনের অর্থায়নের ব্যাপারটি নিয়ে রাজীব বলেন, ‘এটা ভুল ধারণা। ছবিটি যখন নব্বই শতাংশ শুটিং শেষ হয় তখন আমরা করপোরেশনের সাথে যুক্ত হই। আমরা তখন ৫২টি জেলায় শুটিং করেছি, বাকি ছিল সুন্দরবন ও সিলেট। করপোরেশন শুধু আমাদের ওইসব জায়গায় শুটিংয়ের অনুমতি হোটেল ও মোটেলে থাকা-খাওয়া ফ্রি করে দেয়, বিনিময়ে আমরা তাদেরকে আমাদের পার্টনার করি। তাছাড়া তাদের সুপারিশে আমরা তথ্য মন্ত্রণালয়ে সেন্সর ফি মওকুফের আবেদন করি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে সেন্সর ফির চল্লিশ হাজার টাকা মওকুফ করেছিল গত বছরের ১৭ নভেম্বর।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি তো একটা ছবি বানিয়েছি, বিজ্ঞাপন বানাইনি। আর বিদেশিনী আহত হওয়ার ব্যাপারটি দেখালেও কিন্তু ছবি শেষে ঝাঁকে ঝাঁকে এদেশে বিদেশি পর্যটক আসছে তা দেখানো হয়েছে, কাজেই পর্যটন শিল্পের ক্ষতির কারণ দেখছি না। আর এদেশীয় মানুষরাই কিন্তু ওই বিদেশিনীকে সাহায্য সহযোগিতা করে। এতে করে আমরা কিন্তু ছবিতে দেশকে পজেটিভলিই দেখিয়েছি।”

তবে পর্যটন করপোরেশনের সাথে অনুদান নয় পার্টনারশিপের ব্যাপারটি জানালে সেন্সর বোর্ড সচিব বলেন, ‘আমাদের জানা মতে অনুদান রয়েছে। তার চেয়ে বড় কথা পর্যটন শিল্পের জন্য ক্ষতিকর উপাদন রয়েছে এতে। এ ব্যাপারেই আমরা পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মতামতের অপেক্ষায় আছি।’

পরিচালক রাজীবুল জানালেন, সেন্সর বোর্ড থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পেলেই সিদ্ধান্ত নেবেন আপিল করবেন নাকি আদালতে যাবেন।

২০১৪ সালের নভেম্বরে ‘হৃদয়ের রংধনু’র দৃশ্যায়ন শুরু হয়। অভিনয় করছেন শামস কাদির, মুহতাসিন সজন, খিং সাই মং মারমা ও সার্বিয়ান মডেল মিনা চেতকোভিচ। এ চলচ্চিত্রে গান রয়েছে ছয়টি। সঙ্গীত পরিচালনা করছেন সাকিব চৌধুরী, ফারহান ও নীলকণ্ঠ। সিনেমাটি প্রযোজনা করছে এআইএমসি।

Comments

comments

Scroll To Top