সালমানের মৃত্যু থেকে বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্রের হালখাতা (প্রথম পর্ব)

মান্নার ক্যারিয়ারের সব থেকে বড় ব্রেক থ্রু ছিলো সালমান শাহের মৃত্যু। একইভাবে সাকিব খানের ক্যারিয়ারের সব থেকে বড় ব্রেক থ্রূ ছিলো মান্নার মৃত্যু। সালমান শাহ, মান্না হয়ে আজকের শাকিব খান পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রে তারকা অভিনেতাদের নামের লিস্ট কিন্তু বেশ লম্বা। কিছুটা সময়ের জন্য কোন একজনের একছত্র আধিপত্য থাকলেও সমসাময়িক সময়েই একসাথে কয়েকজন তারকা অভিনেতার পর্দা কাপানোর উদাহরণ আছে।

সেই তুলনায় বর্তমান সময়ে এক শাকিব খান ছাড়া দর্শক আকৃষ্ট করার মত তারকা নেই বললেই চলে। এই সময়ে শাকিব খানের পরে যাকে নিয়ে আশা করা যায় তিনি আরিফিন শুভ। যদিও দর্শক হলে টানতে পাড়া তারকা হয়ে উঠতে শুভর আরো কিছু সময় লাগবে। তাই আপাতত আমার ঢাকাই সিনেমার তারকা নায়কদের এই হালখাতা শাকিব পর্যন্তই থাকছে।

সালমানের সাথেই চলচিত্রে শুরু করেছিলেন রিয়াজ। প্রথম ব্রেক থ্রু প্রিয়জন চলচ্চিত্রে সালমানের সাথেই। রিয়াজের প্রথম চলচ্চিত্র ছিলো বাংলার নায়ক। সালমানের মৃত্যুর পড়েই শুরু হয় রিয়াজ যুগের। হৃদয়ের আয়না সম্ভবত তার প্রথম হিট মুভি। সব থেকে বেশী লাইম লাইটে এলেন প্রানের চেয়ে প্রিয় মুভিতে। যতটা মুভিটার জন্য। তার থেকে বেশী ‘পড়েনা চোখের পলক’ গানটার জন্য। সালমানের সাথে চেহারা এবং অংগভঙ্গীতে মিল থাকার কারনে পরিচালকেরা লুফে নিলো রিয়াজকে।

তিরী হলো বাংলা সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম সফল ও রোমান্টিক জুটি শাবনুর-রিয়াজ। প্রেমের তাজমহল এই জুটির সব থেকে সফল চলচ্চিত্র। এছাড়া কাজের মেয়ে, শশুরবাড়ি জিন্দাবাদ, দিল, মোল্লা বাড়ির বউ (মৌসুমি), নারীর মন, বিয়ের ফুল (শাকিল খান) এই জুটির উল্লেখ্য যোগ্য ছবি। কিছু পড়েই তৈরি হলো রিয়াজ-পুর্নিমা। ছবি আসলো মনের মাঝে তুমি (সব থেকে বড় হিট), হৃদয়ের কথা, নিঃশ্বাসে তুমি বিশ্বাসে তুমি (শাবনুর), শাস্তি। পপির সাথেও রিয়াজের একটা ছোট খাট জুটি হয়েছিল। চারিদিকে বিদ্রোহ, ক্ষ্যাপা বসু দুই একটা ছবিও তাদের এসেছিল।

হুট করে একসময় রিয়াজ হারিয়ে গেলো। কেন হারালো? বলছি নিচে।

রিয়াজের পরপরই নাম আসে ফেরদৌসের। তার আগমনও সালমানের মুভিতেই। তবে সালমানের সাথে না। সালমানের ফেলে রাখা অর্ধেক কাজ তিনি করেন, দুর্ঘটনাতে আহত সালমান প্লাস্টিক সার্জারি করে ফেরদৌসে পরিণত হয় (বুকের ভেতর আগুন)। তার পড়েই আসলো ফেরদৌসের সব থেকে বড় হিট আজ অবধি, হটাৎ বৃষ্টি। এই বাংলা না ওই বাংলা। দুই বাংলাতে পা দিয়ে চলতে গিয়ে ফেরদৌস দিশেহারা। ওই বাংলাতে ভালো কিছু করতে পারলেন না। আশা যাওয়াতে থাকলেন। এইখানেও অনেক চেষ্টা করল। ভালো হিট না দিতে পারলেও, অভিনয় প্রতিভাতে তিনি ছাপিয়ে গেলেন রিয়াজকে। তিনটি জাতীয় পুরস্কার যার স্বাক্ষী। ব্যাচেলার, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি, এই মন চাইযে (রিয়াজ,শাবনুর), মেহের নেগার, নন্দিত নরকে, গেরিলা তার উল্লেখ্য যোগ্য সফল চলচিত্র। বাংলাদেশে তার সব থেকে বড় সাফল্য খায়রুন সুন্দরী (মৌসুমি)। সালমান পরবর্তি নায়কদের ভেতর তিনি সব থেকে সফল অভিনেতা।

ফেরদৌস রিয়াজের মাঝে হালকা ভাবে বলতে হয়, শাকিল খানের কথা। প্রথম চলচিত্র ‘আমার ঘর আমার বেহেশত’ দিয়ে আগমন। এটি তার একক সব থেকে সফল চলচিত্র। হিন্দি দিল সিনেমার রিমেক। বেশ কিছু চলচিত্র করলেন তার পড়ে হারিয়ে গেলেন। তার হারিয়ে যাবার পিছনে মুল কারন তিনি নিজে। তারকাখ্যাতি তার হজম হয়নি।

রিয়াজ ফেরদৌস শাকিল খান তিনজনেই লাভার বয় ইমেজের। এদেরকে ভাবা হতো সালমানের উত্তর সূরি। কিন্তু নকল সালমান দিয়ে আর কতদিন? এদিকে বাংলাদেশে সেই সময় ডিশ লাইনের জনপ্রিয়তা পেতে থাকলো (৯০ এর শেষ ভাগ)। আমাদের দর্শকরা পরিচিত হতে লাগলো “এংরি ম্যান” টাইপের নায়কদের সাথে, হলিঊড এবং বলিউড এর কল্যানে।

এই সব লাভার বয় নায়কদের ভেতর একজন এংরি ম্যান ঘুমিয়ে ছিলেন। তাকে জাগালেন কাজি হায়াত। নাম মান্না। চলচিত্র আম্মাজান। (মান্নার প্রথম ব্রেক দাঙ্গা  তে, রাজিবের সেই গা শিউরানো ডায়লগ, আমি কিন্তু মাইন্ড খাইসি, প্রথম যেদিন আমি এই ছবি দেখেছিলাম, শুধু রাজিবের ভয়ে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। একজন খলনায়ক কি পরিমান হিংস্র হতে পারে দাঙ্গা আর প্রমান।)

আম্মাজানের পরে একে একে আসতে থাকলো ঝড়, কষ্ট, বর্তমান, গুন্ডা নাম্বার ওয়ান, কুখ্যাত খুনি, ধর, ভেজা বিড়াল ইত্যাদ্দি। দর্শক লুফে নিলো মান্নাকে। রিয়াজ, ফেরদৌস শাকিল খানের অবস্থা করুন। লাভার বয় আর চাচ্ছে না মানুষ, চাচ্ছে এংরি ম্যান। প্রতিবাদী একজন। যে তাদের হয়ে প্রতিবাদ করবে। মান্নার লুক লাভার বয়দের মত না। তাকে ছবিতে দেখলে সাধারন মানুষ মনে হতো। মানুষের মনে গেঁথে গেলো ব্যাপারটা।

মান্নার আবির্ভাবে শাকিল হারিয়ে গেলো, রিয়াজ , ফেরদৌস টিকে থাকল। এংরি ম্যান হতে গেলো, দর্শক নিলো না। আস্তে আস্তে রিয়াজ হারিয়ে গেলো বড়পর্দা থেকে। ফেরদৌস আবার ওই বাংলাতে ছুটল।

সম্রাজ্য দখলের পরে মান্না ভিন্ন ধাচের ছবিও অভিনয় শুরু করলো। তার লাভার বয় ইমেজের ছবিও আছে অনেক। ‘দুই বধু এক স্বামী’, ‘শত্রু শত্রু খেলা’, ‘রিক্সাওলার প্রেম’ ইত্যাদি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। লোকটা চেষ্টা করেছিলো। অভিনয় এক ধাচের থাকলেও, প্রতিটা ছবিতে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের ইচ্ছা ছিল তার মতন। একবার ভাবুন, এই মানুষটা কাবুলিওয়ালা মুভিতেও অভিনয় করেছে। মান্নার সব থেকে সফল জুটি কোনো নায়িকার সাথে না। মান্না-ডিপজল সেই সফল জুটি।

সাত বছর ছিল মান্নার রাজত্ব। বাংলা চলচিত্র মানেই মান্না। একদিন মান্না চলে গেলো। মান্না পরবর্তি যুগে রিয়াজ, ফেরদৌস দর্শক টানতে পারছিলো না। আগেই বলেছি,তারা লাভার বয় আর মান্না এংরি ম্যান। তাই পার্থক্য থেকে গেলো।

আমাদের তখন দরকার ছিলো একজন এংগ্রি ইয়াং ম্যান এবং লাভার বয়ের। এমন একজন নায়ক আছে যাকে দর্শক যাকে চেনে। প্রায় দশ বছর সে ফিল্ম করছে। অধিকাংশ দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় নায়ক। তাকে তুলে আনলেন ডিপজল। কোটি টাকার কাবিন দিয়ে ( তখনো মান্না বেঁচে ছিলেন)। মান্নার মৃত্যুর পর আর শাকিবকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দ্বিতীয় সালমান তৈরি হয়নি কিন্তু দ্বিতীয় মান্না ঠিকি পাওয়া গেলো। মান্না পরবর্তি বাংলা চলচিত্র বলতে সাকিব খানকেই বোঝানো হয়।

শাকিব খানকে পাল্লা দিতে শুরু করলেন, ডিপজল। খলনায়ক ডিপজল না, নায়ক ডিপজল। মনতাজুর রহমান আকবর এবং রসির সাথে মিলে ডিপজল একের পরে এক হিট ছবি দিতে থাকলেন। রসির বিয়ে এবং ডিপজলের রাজনৈতিক জীবন তাকে ঠেলে দিলো দূরে। তবে মানুষ ডিপজলকে আপন করে নিয়েছিলো। কারন তার সাধারনের মত চেহারা, আঞ্চলিক ভাষাতে কথা। এগুলো মানুষ পছন্দ করত।

সালমান শাহ পথ বন্ধ করে দিয়েছিল ওমর সানি, আমিন খান আর অমিত হাসানের। এই তিন প্রতিভা আর কখনো তাই বিকশিত হতে পারে নাই সেভাবে। এই তিনজনেরিই চলচিত্রে অভিষেক সালমানের আগে। ওমর সানির চলচিত্র জীবনে সব থেকে বড় প্রাপ্তি মৌসুমি। আমিত হাসান আমিন খানের সব থেকে বড় প্রাপ্তি, মান্নার চলচিত্রে দ্বিতীয় নায়ক।

আরও একজন অমিত প্রতিভা ছিল। আমি তাকে বলি, সে বাংলা চলচিত্রে সব থেকে বড় অব্যাবহারিত প্রতিভা। চলচিত্রে এসেছিলেন ১৯৮৬ সালে। তিনি বাপ্পারাজ। আমার কথা বিশ্বাস না হলে চাপা ডাঙ্গার বউ, বাবা কেন চাকর, সন্তান যখন শ্ত্রু, প্রেমের সমাধি, ঢাকা-৮৬, জিনের বাদশা চলচিত্র গুলো দেখেন। আফসোস, বাবার আড়ালেই লোকটাকে হারিয়ে যেতে হলো। সালমান পরবর্তি সময়ে বাবা কেন চাকর, প্রেমের নাম বেদনা, সন্তান যখন শত্রু, প্রেমের সমাধির মত হিট ছবি দিলেও এই সু অভিনেতা নজর কাড়তে পারেনি দর্শকদের।

এর পড়ে আরেকজন নায়কের নাম বলব, যিনি বর্তমানে কমিক হিরো হয়ে গেছে, কাজী মারুফ। মারুফের একটা ভাল ভবিষ্যৎ ছিল। কিন্তু সেটার পুরোটাই নষ্ট করেছে তার বাবা কাজী হায়াৎ( যিনি রোমান্টিক ডায়ালগ দিলেও মনে হয় ভাষন দিচ্ছেন)। মারুফের অন্য মানুষ, ইতিহাস চলচিত্র দেখেন সময় পেলে। অনেক ভালো অভিনয় করেছে। চোখে পানি এনে দিতে পারে তার এই দুইচলচিত্রের অভিনয়। তবে হ্যাঁ মান্নার ছোঁয়া আছে। এই সুযোগে একটু আফসোস ও আছে, কাজী হায়াৎ কেন হারিয়ে গেলেন তা আজো রহস্য। দাঙ্গা, আম্মাজান, ইতিহাসের মত কালজয়ী চলচিত্রের পরিচালক এখন ইভ টিজিং, সর্বনাশা ইয়াবার মত হাস্যকর চলচিত্র পরিচালনা করেন। আফসোস।

পরের পর্বঃ সালমানের মৃত্যু থেকে বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্রের হালখাতা (দ্বিতীয় পর্ব)

Comments

comments

Scroll To Top
0