বলিউডে খানদের স্টারডামঃ শেষ বিকেলের ডুবন্ত সূর্য শাহরুখ খান! (তৃতীয় ও শেষ পর্ব)

(দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে) আগের দুইটি পর্বের লেখাগুলো পুরোটাই সংখ্যা নির্ভর ছিলো, মানে তিন খানের সিনেমার ব্যবসায়িক দিকটাই প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিলো। কিন্তু আপনি যখন শাহরুখ খানের মত একজন তারকাকে নিয়ে লিখবেন তখন স্বাভাবিক কারনেই এই ব্যাবসায়িক তথ্য উপাত্তের বাইরের কিছু কথা এবং হিসেব নিকাশ চলে আসে। আজকে এই লেখার তৃতীয় এবং শেষ পর্বে সেই বিষয়গুলোই বিবেচনা করা হয়েছে।

কিছুদিন আগে তিন খানের লড়াই নিয়ে ইকোনমিক টাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রাজেশ নাইডুর ওই প্রতিবেদনটিতে শাহরুখ খানকে নিয়ে ভারতীয় সিনেমা সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের মতামত উঠে আসে। এই লেখার বিষয়বস্তুর সাথে মতামতগুলো প্রাসঙ্গিক, তাই সেগুলো এখানে অন্তর্ভূক্ত করা হলো।

শাহরুখ টেলিভিশনে ‘সার্কাস’ নামের একটি সিরিয়ালে অভিনয় করতেন। ১৯৮০ সালে দূরদর্শনে প্রচারিত সেই সিরিয়ালে শাহরুখের সহ-অভিনেত্রী রেনুকা সাহানে বলেন, ‘শাহরুখ সার্কাসে অভিনয় করেছেন। এরপরও জানতাম তিনি বড় পর্দায় ভালো করবেন। তাঁর সহজাত একটি দক্ষতা ছিল, যা ওই সময়ের অধিকাংশ অভিনেতার নেই। এমনকি তিনি নেতিবাচক চরিত্রগুলোতেও ভালো করতেন এবং দর্শকেরা তা গোগ্রাসে গিলত। তিনি ঝুঁকি নিয়েছেন। ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস ছিল শাহরুখের ক্যারিয়ারের অন্যতম একটি দিক। মূল বিষয়টি ছিল, তিনি বেছে বেছে মানুষের সঙ্গ কাজ করতে পছন্দ করেন। তাঁর এই গুণটি অভিনেতা হিসেবে অন্যের সঙ্গে বিশাল পার্থক্য গড়ে দেয়।’

শাহরুখ অভিনীত ‘কাল হো না হো’র পরিচালক নিখিল আদভানি। এই পরিচালকের মন্তব্য হলো, আত্মপ্রকাশ থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত একজন অভিনেতা হিসেবে শাহরুখের বিবর্তন বিস্ময়কর। তিনি আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বহুমুখী প্রতিভাধর একজন অভিনেতা হিসেবে নিজেকে পরিণত করেছেন। এখানে দুটি কারণ তাঁর পক্ষে কাজ করেছে। ছবির ব্যবসায়ী দিক বোঝা ছাড়াও সৃষ্টিশীলতার দিকটি বুঝতে সমান পারদর্শী। এই গুণ তাঁকে অবিশ্বাস্য রকমের এক খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। এটা শাহরুখের পাশের সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছে।

মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং চলচ্চিত্র বিশ্লেষক সঞ্জয় রানাদে বলেন, ১৯৯০ সালের দিকে শাহরুখ খান হিন্দি সিনেমার চেহারা পরিবর্তন করে দিয়েছেন। ‘১৯৯০ সালে শাহরুখ হিন্দি সিনেমার নির্মাণ কৌশলে পরিবর্তন এনেছেন। ঘর-দোর, শয়নকক্ষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিন্দি সিনেমায় পোশাকে পরিবর্তন এনেছেন। সিনেমার গল্প হয়েছে শহরকেন্দ্রিক। তরুণদের প্রতি মনোযোগী হয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষদের সিনেমামুখী করেছেন তিনি। সুন্দর সুন্দর আকর্ষণীয় স্থানগুলো যাদের দেখার অবকাশ বা সামর্থ্য নেই, তাদের তিনি সিনেমার মধ্য দিয়ে সেসব জায়গায় নিয়ে গেছেন।’ বলছিলেন সঞ্জয় রানাদে।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে শাহরুখ খানের সিনেমার গল্প নির্বাচন, এবং সময়োপযোগী বিষয়বস্তুর উপর গুরুতব আরোপ করে পিয়ুস রায় বলেন, ‘বয়স বুঝে শাহরুখের এখন ছবিতে অভিনয় করা উচিত। তাঁর পছন্দের ব্যাপারটি ৯০-এর দশকের অমিতাভ বচ্চনের ‘বড়ে মিয়া ছোটে মিয়া’ ছবির মতো। শাহরুখ যত তাড়াতাড়ি এ ব্যাপারটি বুঝতে পারবেন এবং দর্শকদের রুচি বুঝতে সক্ষম হবেন, ততই তাঁর ক্যারিয়ারের জন্য মঙ্গল হবে।’ মূলত ‘স্বদেশ’ (২০০৪) এবং ‘চাক দে ইন্ডিয়া’য় (২০০৭) শাহরুখ যা করেছেন, তা-ই করা উচিত তার।

‘কিং অব বলিউড: শাহরুখ খান’-এর লেখক সিনেমা সমালোচক অনুপমা চোপড়া কিন্তু একমত নন পিয়ুসের সঙ্গে। তাঁর কথা হলো, শাহরুখ যথেষ্ট করেছেন, নিজেকে নতুনভাবে গড়েও তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘তাঁর সর্বশেষ কয়েকটি ছবি দেখলেই ব্যাপারটি স্পষ্ট হবে। তিনি ‘ফ্যান’ ছবিতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। যদিও এ ছবিটি সুপার ডুপার হিট হয়নি, তবে আপনি তার প্রচেষ্টা দেখতে পারেন। তিনি ছবির প্রথমার্ধে অনবদ্য ছিলেন।’

অনুপমা চোপড়ার সঙ্গে একমত রেনুকা সাহানে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, ৫১ বছর বয়সে শাহরুখ পর্দায় পরিপক্বভাবে অভিনয় করছে, যেমন দেখুন “ডিয়ার জিন্দেগি”-তে। আমি তাঁর কাছে আশা করি, বয়সের সঙ্গে যা মানায়, তেমন স্ক্রিপ্ট দেখেই ছবি হাতে নেওয়া উচিত। আমি মনে করি না যে শাহরুখকে নতুনভাবে গড়ার খুব একটা প্রয়োজন আছে। তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যায়, এমন সাহসী বিষয় বেছে নিলে তাঁর জন্য ভালো।’

পিয়ুস রায় বলেন, শাহরুখ হচ্ছেন এমন এক তারকা, যিনি ভক্ত-দর্শকদের আনন্দ দেন। তাঁর কাছ থেকে তা-ই প্রত্যাশা করা হয়। পর্দায় তিনি সঞ্জীব কুমার বা নাসিরুদ্দিন শাহ হবেন, এটা আশা করা ঠিক হবে না। এখন তাহলে শাহরুখের কি করা উচিত—তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন পিয়ুস রায়। তিনি বলেন, ‘পরিপক্ব রোমান্টিক ভূমিকার দিকে নজর দিতে হবে শাহরুখকে। ইমতিয়াজ আলীর পরবর্তী ‘রিং’ (শাহরুখ-আনুশকা) সিনেমা নিয়ে আমার উচ্চাশা আছে। এই ছবি দিয়ে নতুন একটি ধারা বা যুগের শুরু হতে পারে।’

‘কাভি হা কাভি না’-এর পরিচালক শাহরুখের পছন্দের একজন কুন্দন শাহ বলেছেন, ‘আমি মনে করি, একজন অভিনেতাকে তাঁর শক্তির জায়গাটা বুঝতে হবে। আমি যখন তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি, আমি বুঝলাম যে তিনি রোল অনুযায়ী ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য ফিট। তিনি উচ্ছ্বাস, উদ্দীপনা এবং করুণ রসের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দক্ষ ব্যক্তি। আমি ভেবেছিলাম, তিনি এভাবেই নিজেকে পর্দায় তুলে ধরবেন। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত রোমান্টিক নায়ক হতে গেলেন।’

পরিশেষে বলা যায় সংখ্যার বিচারে বিবেচনা করার জায়গায় এখন আর শাহরুখ খান নেই। চেন্নাই এক্সপ্রেস, হ্যাপি নিউ ইয়ার, দিলওয়ালে, ফ্যান – চার চারটি নিম্নমানের ছবি উপহার দিয়ে শাহরুখ খান হতাশ করেছেন তার অগণিত ভক্তদের। শাহরুখের মুভি দেখে আগের মতো উন্মাদনায় মাতে না দর্শকরা, অথচ বাকি দুই খান দিন দিন আর উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছেন। তাই কিং খানকে এখন কিং এর মতো করেই ভাবতে হবে। নিজের ২২ বছরের অভিজ্ঞতা দিয়েই নিজের অবস্থান ফিরিয়ে আনতে হবে। নাহলে বাস্তব হবে সবদিকে উঠা সেই হায় হায় রব– শেষ বিকেলের ডুবন্ত সূর্য শাহরুখ খান!!!

দ্বিতীয় পর্বঃ বলিউডে খানদের স্টারডামঃ শেষ বিকেলের ডুবন্ত সূর্য শাহরুখ খান! (দ্বিতীয় পর্ব) 

প্রথম পর্বঃ বলিউডে খানদের স্টারডামঃ শেষ বিকেলের ডুবন্ত সূর্য শাহরুখ খান! (প্রথম পর্ব)  

তথ্যসূত্রঃ

১। বক্স অফিস রিপোর্টঃ বক্স অফিস ইন্ডিয়া

২। আর্টিক্যেল সহায়তাঃ বলিউড হাঙ্গামা, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইকোনমিক টাইমস, হিন্দুস্থান টাইমস

Comments

comments

Scroll To Top