কলকাতার বাংলা সিনেমায় নগ্নতার অভ্যূত্থানঃ কবে এবং কিভাবে? (দ্বিতীয় পর্ব)

‘কসমিক সেক্স’ সিনেমার দৃশ্য

কলকাতা বাংলার তরুণ প্রতিভাশালী নির্মাতা কৌশিক, যিনি কিউ নামেই পরিচিত। ‘গান্ডু’ নির্মাণ করেই কলকাতা বাংলা সিনেমায় বেশ হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন।গান্ডু আগাগোড়া একটা ‘এক্স’ রেটেড একটি সিনেমা। কলকাতার মতো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এমন দুর্দান্ত সাহসী কাজ তার আগে কেউ করার সাহস করেনি। যদিও ‘গান্ডু’ শেষ পর্যন্ত অশ্লীলতার দায়ে নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

২০১৫ সালে অনলাইনে মুক্তি পেলো ২০১২ সালে বানানো অমিতাভ চক্রবর্তীর ছবি ‘কসমিক সেক্স’। যা কলকাতা ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের নানা প্রতিবন্ধকতার পর অভিনব পদ্ধতিতে গত ১ ফেব্রুয়ারি ইন্টারনেটে পৃথিবী ব্যাপী মুক্তি দেয়া হয়। সিনেমা হলে মুক্তির চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে অমিত চক্রবর্তী অবশেষে এই অভিনব পদ্ধতিতে সিনেমা মুক্তি দিলেন।

‘কসমিক সেক্স’ কলকাতা বাংলার সিনেমা ইতিহাসে অন্যতম একটি বিতর্কিত ছবি হয়েই থাকবে।কারণ এটি প্রথম কোনো বাংলা ছবি, যা সেন্সরবোর্ডের অনুমতি না পেয়ে ইন্টারনেটে মুক্তি দেয়া হয়। ছবিটি বাউল ফকিরদের জীবন দর্শন নিয়ে নির্মিত। বাউলদের ‘কাম’-ই সিনেমার উপজীব্য বস্তু, পরমাত্মাকে স্পর্শ করতে জাগতিক কাম-কে বশে আনার কাহিনীই বলা যায় ‘কসমিক সেক্স’।কিন্তু সিনেমায় এতো সরাসরি বিষয়গুলো নির্মাতা ডিল করেছেন যে, তা হয়তো সিমো হলে প্রচারের যোগ্য মনে করেননি কলকাতার সেন্সর বোর্ড। গান্ডুর পর সিনেমাটিতে ঋ সেন ফের তার সাহসের ভয়ঙ্কর রূপ দেখিয়েছেন। আপাদমস্তক নগ্ন হতে এর আগে কলকাতা কেনো, পুরো ভারত বর্ষের সিনেমায় অনুপস্থিত ছিলো।

কলকাতা বাংলা সিনেমায় ‘থ্রি অন আ বেড’ যুগান্তকারি এক প্রয়াস; কি গল্পে, আর কি চিত্রায়নে। ছবিটি প্রযোজনা করেছে সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট। রাজদীপ পাল এবং শর্মিষ্ঠা মাইতির দুর্দান্ত সাহসী ছবি ‘থ্রি অন আ বেড’।এক নারী ও দুই পুরুষের একত্রে বাস করার কাহিনী নিয়ে নির্মিত এই ছবি। তিন জনের সহবাস আর যাপনকে সমাজ কি চোখে দেখে তার মোটামুটি একটা সফল চিত্রায়ন। গল্পের প্রয়োজনেই প্রচুর খোলামেলা আর ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের ফুলঝুড়ি ঘটে ছবিতে।

স্বত্বিকা মূখার্জীর ‘টেক ওয়ান’

কলকাতা বাংলা সিনেমায় আরেক সাহসী নির্মাতা মৈনাক ভৌমিক। গত বছর তিনি তিনি নির্মাণ করেছেন কলকাতা বাংলার টপ রেডেট অভিনেত্রী স্বস্তিকা মূখার্জীকে নিয়ে ‘টেক ওয়ান’। ছবিতে একেবারে খোলামেলা চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন স্বস্তিকা। গত বছর কলকাতায় স্বস্তিকার ‘টেকওয়ান’-এ বিবসনা দৃশ্য নিয়ে শিক্ষার্থীদেরও ক্ষোভের মুখে পড়েছিল পুরো ‘টেকওয়ান’ টিম।

মৈনাক ভৌমিক পরিচালিত এ সিনেমাতে স্বস্তিকা প্রায় বিবসনা হয়ে ক্যামেরাবন্দি হয়েছিলেন স্বস্তিকা। এতে জনৈ মডেলের সঙ্গে স্বস্তিকার একাধিক আবেগঘন দৃশ্য রয়েছে। তবে সেন্সরে কর্তনের ভয়ে সিনেমাতে স্বস্তিকার বিবসনা দৃশ্যগুলো কিছুটা অস্পষ্ট করে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু বাইরের চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে সিনেমাটির দৃশ্যগুলো স্বাভাবিক রেখেই পাঠানো হয়েছে।

যৌনতায় রিষ্টপুষ্ট মৈনাকের আরেক চলচ্চিত্র ‘আমি আর আমার গার্ল ফ্রেন্ড’। ২০১৩ মুক্তি পায় চলচ্চিত্রটি। এটি রচনা, চিত্রনাট্যরচনা এবং পরিচালনা করেছেন মৈনাক ভৌমিক নিজেই। অভিনয়ে ছিলেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, পার্ণো মিত্র, রাইমা সেন, বিক্রম চ্যাটার্জি, বিশ্বনাথ বসু, নীল মুখার্জি, অনুবর্ত বসু প্রমুখ। তিনজন বাঙালি মেয়ের বন্ধুত্ব এবং তাদের নিজস্ব জগতের মধ্যে এই চলচ্চিত্রের গল্প আবর্তিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি। মুক্তির পর যথারীতি ব্যাপক আলোচিত হয় সিনেমাটি।

বহুল বিতর্কিত ‘গাণ্ডু’ সিনেমা দৃশ্য

ঋতুপর্ণ ঘোষ সমকামী পুরুষের গল্প, রূপান্তরকামীর গল্প বলে গিয়েছেন। কিন্তু সমকামী নারীর গল্প ককাতা বাংলা ছবিতে সে রকম উঠে আসতে দেখা বাকি ছিল। মৈনাক ভৌমিকের ‘ফ্যামিলি অ্যালবাম’ সেই শূন্যস্থানটা পূরণ করতে চাইছে। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে স্বস্তিকা আর পাওলি অভিনীত দুই নারীর সমকামিতার গল্প নিয়ে ছবি ‘ফ্যামিলি অ্যালবাম’। মুক্তির পর থেকেই কলকাতায় এই ছবি নিয়ে চলছে ব্যাপক সমালোচনা। ছবিটিতে সমকামি নারীর চরিত্রে জনপ্রিয় আলোচিত অভিনেত্রী স্বস্তিকা মূখার্জী ও পাওলি দাম অভিনয় করে যেনো সেই আলোচনা আরো উস্কে দিচ্ছে। সমালোচকদের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে ক্লান্ত এখন পরিচালক। যদিও নির্মাতা মৈনাক তীব্র সমালোচনার মুখে ‘ফ্যামিলি অ্যালবাম’ ছবিটিকে মিষ্টি প্রেমের ছবি বলে উল্লেখ করেছেন।

‘আমি আর আমার গার্ল ফ্রেন্ড’ এর দৃশ্য

এছাড়াও কলকাতা বাংলা সিনেমায় এ সময়ে যারা মূল ধারার বাইরে গিয়ে ছবি নির্মাণ করছেন, তাদের প্রায় সব ছবিতেই থাকে যৌনতার প্রবল সুড়সুড়ি। গৌতম ঘোষ কিংবা এ সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় নির্মাতা সৃজিত মূখার্জীও এর বাইরে নয়।তার সাম্প্রতিক মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘নির্বাক’ও তো একজন নিঃসঙ্গ অবদমিত পুরুষের গল্প দেখাতে গিয়ে যৌনতার আশ্রয় নিয়েছেন।

Comments

comments

Scroll To Top