চলচ্চিত্রের চলমান অস্থিরতা এবং ‘অপারেশন অগ্নিপথ’ পরিচালকের কিছু প্রশ্ন!

যৌথ প্রযোজনা সংক্রান্ত আন্দোলন এবং পাল্টা আন্দোলনের কারনে বিগত কয়েক মাস ধরেই ঢাকাই চলচ্চিত্রে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। শাকিব খান সহ যৌথ প্রযোজনার সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে এফডিসিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, অবস্থান ধর্মঘটে মধুমিতা হলের মালিককে মারধর এবং তারই প্রেক্ষিতে আজকে প্রদর্শক সমিতি কতৃক মিশা-রিয়াজ-খশরুর ছবি হলে না চালানো ঘোষণা। একের পর পাল্টাপাল্টি ঘাত প্রতিঘাতে আক্ষরিক অর্থেই বিভক্ত বাংলা সিনেমা জগতের মানুষ।

এই চলমান অস্থিরতার কারনে, হুমকির মুখে পড়ছে নির্মানাধীন বেশ কয়েকটি সিনেমা। সিনেমাগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষজনের নিজেদের মধ্যে বিভাজনের কারনে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন সিনেমাগুলোর প্রযোজক পরিচালক। এ রকমই একজন পরিচালক আজ জানালেন তার আর্তনাদের কথা। এই চলমান অস্থিরতার কারনে সৃষ্ট জটিলতার কথা উল্লেখ করে কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্নও করেছেন একজন পরিচালক।

তিনি আর কেউ নন, ‘মুসাফির’ খ্যাত পরিচালক আশিকুর রহমান। এই মুহুর্তে এই পরিচালকের নির্মানাধীন সিনেমা ‘অপারেশন অগ্নিপথ’, যাতে অভিনয় করছেন শাকিব খান। চলচ্চিত্রের এই অস্থিরতায় পরিচালক আশিকুর পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। তার এই সিনেমার প্রধান দুই অভিনেতা হচ্ছেন শাকিব খান এবং মিশা সওদাগর। চিত্রনায়ক ফারুককে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের কারনে এফডিসিতে অবাঞ্ছিত শাকিব খান, আর এদিকে প্রদর্শক সমিতির ঘোষণা অনুযায়ী মিশা সওদাগরের কোন ছবি হলে প্রদর্শন করবেন না তারা!

এই বিষয়গুলোকে সামনে এনে পরিচালক আশিকুর রহমান আজ তার ফেসবুকে একটি বিশাল স্ট্যাটাস তুলে ধরেন। এতে তিনি তার সিনেমার নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেন। নীচে তার সেই লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

“আমি যা লিখতে যাচ্ছি তা অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পরার অনুরোধ রইল।

গত কয়েক মাস ধরে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে সংকটময় সময় যাচ্ছে বলে আমি মনে করি। একে তো চলচ্চিত্রের ঘোর সংকটকাল, তার উপরে একে অন্যের উপর অভিযোগ, সব মিলিয়ে , সামনের দিন গুলোতে বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্কট এরও গভীর হচ্ছে বলে মনে করি । এই ক্ষেত্রে সবারই চলচ্চিত্রের স্বার্থে কিছুটা পরিশালিত আচরণ কাম্য। তাই এই মুহূর্তে আমার নিজের অবস্থান ও কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে চাচ্ছি।

বেশ কয়েক দিন আগে আমাদের সম্মানিত পরিচালক সমিতি , চিত্রনায়ক শাকিব খানকে বয়কট করল। তার মানে তার সাথে পরিচালক সমিতির কোনও সদস্যের কাজ করাটা কাম্য নয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, শাকিব খান তো “অপারেশন অগ্নিপথ” এর কাজ গত বছর শুরু করেছেন, সামনে আমাদের শুটিং, আমরা কি তাহলে বাকি শুটিং এর কাজ করব না? আমরা কি দর্শকদের একটা সুন্দর চলচ্চিত্র উপহার দিতে পারব না? আমি একটা কথা নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে চাই, অগ্নিপথে শাকিব খানের অভিনয়, এই চলচ্চিত্র টিকে অন্য এক জায়গায় নিয়ে যাবে আশা করি। দর্শক কি তাহলে শাকিব খানের এই অভিনয় দেখতে পারবে না? আমাদের পুরো টিম একটা সুন্দর বাংলাদেশি চলচ্চিত্র উপহার দিতে চাচ্ছি, এটা তো আমাদের দোষ না। অগ্নিপথের জন্য প্রযোজক, ক্রু, আর্টিস্ট সবাই যে পরিশ্রম করেছে এবং করছে তার মূল্য কি এটা? উল্লেখ্য অগ্নিপথ এই মুহূর্তে বাংলাদেশ এর একক প্রযোজনায় সবচেয়ে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র। সম্মানিত চলচ্চিত্র পরিবারের কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন, যৌথ প্রযোজনা নিয়ে আন্দোলনের শাস্তি কি তাহলে দেশি সিনেমা পাবে ??? অগ্নিপথের টিম, দর্শক আমরা তো কোনও দোষ করি নি। আমার প্রশ্নের উত্তর জানার অপেক্ষায় থাকলাম।

আজ নিউজ দেখলাম, প্রদর্শক সমিতি মিশা সউদাগর কে নিষিদ্ধ করেছে। তার মানে আমাদের অগ্নিপথের শুটিং মিশা সউদাগরকে বাদ দিয়ে করতে হবে। এরূপ পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে আমরা যদি সেটা করি, তাহলে এই কথা আমি ১০০% নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, বাংলাদেশ এর মানুষ বাংলা চলচ্চিত্রের অসাধারণ এক অভিনয়ের অভিজ্ঞতা মিস করবেন। মিশা সউদাগর যে অভিনয় আমাদের সেখানে দিয়েছেন, সেটা দেখাতে না পারলে, অপূরণীয় এক ক্ষতি হিসাবে দর্শকদের মনে প্রশ্ন হিসাবে থেকে যাবে। মিশা ভাই এর অভিনয় যদি “Out of the world” না হয়, তাহলে দর্শক যে শাস্তি দিবে তা আমি মাথা পেতে মেনে নিব। বেক্তিগত সমস্যাকে প্রফেশনাল জায়গায় না আনার, বিনীত অনুরধ রইল।

আমি বয়সে অনেক তরুণ, হয়তবা আমাদের গুরুজন দের তুলনায় আমি অনেক সামান্যই বুঝি। তারপরও আমাদের চলচ্চিত্রের গুরুজনদের প্রতি অনুরোধ করব, বয়কট কোনও সমস্যার সমাধান নয়। বয়কটের মাঝখানে পরে আমাদের মত নতুনদের ক্ষতি আশা করি আপনারা কেওই চান না। আপনারা বড় মানুষ, গুণীজন, আমাদের মত তরুণদের উপর এমন কোনও দাবি চাপিয়ে দেবেন না, যেন আমরা অভিমান করে চলচ্চিত্র, ইন্ডাস্ট্রি, দেশ ছেড়ে চলে যাই। কারণ এক তরুণকে দেখেই আরেক তরুণ অনুপ্রাণিত হয়ে এই ইন্ডাস্ট্রিতে আসবে। এবং তরুণদের ছাড়া একটা ইন্ডাস্ট্রি চলতে পারেন না। কারণ চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ে আপনারা ও তরুণ ছিলেন। আমরা আপনাদেরই পথ অনুসরণ করে এসেছি। চলচ্চিত্রের এই ইন্ডাস্ট্রিতে সবাইকেই সবার প্রয়োজন। সবারই এই ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক অবদান আছে। শান্তি পূর্ণ সমাধান হলে, সেটা ইন্ডাস্ট্রিরই মঙ্গল। তা না হলে সামনে ধ্বংস ছাড়া এর কিছু দেখার থাকবে বলে আমি মনে করি না।

**** আমি যথেষ্ট চেষ্টা করেছি কারও অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে আমার বক্তব্য ও অবস্থান পরিষ্কার করতে। তারপরও যদি কাওকে কষ্ট দিয়ে থাকি, তাহলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল।

এখন কথা হচ্ছে একজন পরিচালকের এইসব প্রশ্নের উত্তর কে দিবেন? এইরকম আরো অনেক পরিচালকেরই আর্তনাদ চাপা পড়ছে চলমান এই আন্দোলনের হুংকারে। আমরা আশা করছি, ইন্ডাস্ট্রির কথা বিবেচনা করে পারস্পরিক বিভেদ ভূলে নতুন করে একসাথে কাজ করবে আমাদের চলচ্চিত্র পরিবার। ভালো কিছুর আশায়। বাংলা সিনেমার জয় হোক।

Comments

comments

Scroll To Top